মুক্তিযুদ্ধের সাহসী কলম সৈনিক একজন নুরুল আলম ফরিদ - দৈনিক বরিশাল ২৪ দৈনিক বরিশাল ২৪মুক্তিযুদ্ধের সাহসী কলম সৈনিক একজন নুরুল আলম ফরিদ - দৈনিক বরিশাল ২৪

প্রকাশিতঃ মার্চ ০১, ২০২২ ১:০৫ পূর্বাহ্ণ
A- A A+ Print

মুক্তিযুদ্ধের সাহসী কলম সৈনিক একজন নুরুল আলম ফরিদ

আহমেদ জালাল:: একাত্তরে বেয়নেটের ধার আর বারুদের গন্ধ গায়ে মেখে ‘বিপ্লবী  বাংলাদেশ’ পত্রিকার জন্ম মুক্তঞ্চলে। অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশে যুদ্ধের ময়দানে পাকহানাদারদের প্রতিরোধে মুক্তিযোদ্ধারা সোচ্চার, ঠিক সেই মুহূর্তে সাংস্কৃতিক শৃঙ্খল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ছিলো-‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’। রণাঙ্গনের পত্রিকা ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ সেই দিনের পশ্চিমা অনুশাসনকে ভয় পায়নি। নির্ভয়ে লেখা হয়-পাকিস্তানের স্বৈরশাসক তথা স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গির বিরূদ্ধে। এক হাতে অস্ত্র আরেক হাতে কলম, সেদিন মৃত্যুকে কেউ ভয় পায়নি। তাই ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ এর ইতিহাস স্বাধীনতা যুদ্ধেরই ইতিহাস। নূরুল আলম ফরিদ এর সম্পাদনায় প্রকাশিত সেদিনকার ‘ ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ” পত্রিকার ভূমিকা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের ‘সাপ্তাহিক ক্যাম্পাস’   মন্তব্য করেছিল- ‘৯ নম্বর সেক্টর থেকে ” ‘বিপ্লবী  বাংলাদেশ” নামে পত্রিকা স্বাধীনতা যুদ্ধে একটি দূরপাল্লার কামানের চেয়েও বেশী কাজ করেছে। ”পত্রিকা ছাপা শেষে নূরুল আলম ফরিদ ফিরে গেলেন সীমান্তের ৯ নম্বর সেক্টর ক্যাম্পে, হাসনাবাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবির, অপারেশন ক্যাম্প ও বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যখন পত্রিকাটি পৌঁছে তখন ক্যাম্পে ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ নিয়ে উল্লাস ধ্বনি শুরু হয়। পত্রিকাটি যেন তাদের কাছে একটি বিজয়ী রণক্ষেত্র। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনে যে পত্রিকার জন্ম সেই পত্রিকা ” ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ”। বহু ঘাত প্রতিঘাত করে আজও মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে সমুন্নত রেখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে ‘ ‘বিপ্লবী  বাংলাদেশ”।

যিনি একহাতে অস্ত্র, আরেক হাতে কলম নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, নাম তাঁর নূরুল আলম ফরিদ। বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ নিজের জবানবন্দীতে মুক্তযুদ্ধকালীন নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। একাত্তরে একাধিকবার সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলা করেছেন এই বীর সেনানী৷ ঈদের দিনে পারুলিয়া এলাকা শত্রুমুক্ত করেছিলেন তাঁরা৷ নূরুল আলম ফরিদ বলেন, সেদিনের কথা এখনো পরিষ্কার মনে আছে আমার৷ তাঁর ভাষ্য, ‘‘সেপ্টেম্বরের এক ঈদের দিন, সম্ভবত ২৬ সেপ্টেম্বর আমরা পারুলিয়া শত্রুমুক্ত করেছিলাম৷ সেসময় আমাদের বেশ কয়েকজন আহত হন৷ তবে শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষকে আমরা চারিদিক থেকে ঘিরে ধরতে সমর্থ হই৷ এভাবেই আমরা পারুলিয়া শত্রুমুক্ত করি৷’

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ বলেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বরিশাল পলিটেকনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সে সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আমার মেঝ ভাই ‘‘নূরুল ইসলাম মঞ্জুর’’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মার্চের ১ম সপ্তাহ থেকে বরিশালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়কারী ছিলেন ‘‘নুরুল ইসলাম মঞ্জু’’ (এম.এন.এ)। এবং আমাদের বাসা ছিল সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম। সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম থেকে বৃহত্তর বরিশালের সকল থানা ও মহাকুমার সবাইকে তথা ছাত্র, কৃষক ও জনতাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হত। বৃহত্তর বরিশাল জেলার সব এম.এন.এ ও এম.পি ও ছিল সংগ্রাম পরিষদের সদস্য।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ বলেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বরিশাল পলিটেকনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সে সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আমার মেঝ ভাই ‘‘নূরুল ইসলাম মঞ্জুর’’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মার্চের ১ম সপ্তাহ থেকে বরিশালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়কারী ছিলেন ‘‘নুরুল ইসলাম মঞ্জু’’ (এম.এন.এ)। এবং আমাদের বাসা ছিল সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম। সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম থেকে বৃহত্তর বরিশালের সকল থানা ও মহাকুমার সবাইকে তথা ছাত্র, কৃষক ও জনতাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হত। বৃহত্তর বরিশাল জেলার সব এম.এন.এ ও এম.পি ও ছিল সংগ্রাম পরিষদের সদস্য।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ বলেন, ৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনিত সব এম.এন.ও এমপিরা নির্বাচিত হয়। তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানিরা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে টালবাহানা করতে থাকে। ৭১ এর ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান বিশাল জনসভায় ইয়াইয়াকে সংসদ অধিবেশন ডাকার আহবান করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা ও সরকার গঠনের আহবান জানান। সেই দিন বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু দেশবাসিকে নির্দেশ দেন, পশ্চিম পাকিস্তান যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্থান্তর না করেন, তবে জনগণ যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যেন স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইয়াইয়া খান টালবাহানা করে সময় নিয়ে পশ্চিমা সৈন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জড়ো করে। ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যায় পশ্চিম পাকিস্তান চলে যায় ইয়াইয়া খান। সেই দিন রাত ১১ টায় পাক বাহিনী রাজারবাগ পিলখানা সহ ঢাকার শহরে ট্যাংক এবং সজোয়া বাহিনী নামিয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। রাত সাড়ে ১১টায় নোয়াখালীর এম.পি খালেদ মোহামদ আলী, নুরুল ইসলাম মঞ্জুরকে কন্ট্রোলরুমে ফোন করে জানান-পাক বাহিনী সারা শহরে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে এবং ক্ষমতা হস্থান্তর করবে না। তৎকালীন সময়ে নুরুল ইসলাম মঞ্জুর উপস্থিত এম.এন.এ ও এম.পি সবাই মিলিত হয়ে বরিশাল পুলিশ লাইন থেকে অস্ত্র এনে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার সিদ্বান্ত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাত সাড়ে তিনটায় বগুড়া রোডস্থ পেশকার বাড়ী অর্থাৎ আমাদের বাসায় পুলিশ লাইন থেকে সব অস্ত্র নিয়ে এসে ২৬ শে মার্চ সকাল ৬ টায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অস্ত্র বিতরণ করা হয়। সকাল ১০ টায় আমাদের বাসার সম্মুখে সদর গালর্স স্কুলে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্ব বৃহত্তম দক্ষিণাঞ্চলে প্রথম সচিবালয় গঠন করা হয়। বৃহত্তর বরিশালের সকল জেলা প্রশাসক, জজ এবং সব কর্মকর্তা কর্মচারীকে এ সচিবালয় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলীয় সচিবালয় এর বেসাময়িক প্রধান ছিলেন এম.এন.এ নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও সামরিক প্রধান ছিলেন মেজর এম.এ জলিল, সহ প্রধান ছিলেন ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা। এ সময় শক্তিশালী ১১ বিশিষ্ট এক কমিটি গঠন করা হয়। বেসামরিক বিভাগ : নুরুল ইসলাম মঞ্জুর (এম.এন.এ), প্রতিরক্ষা বিভাগ : মেজর এম.এ জলিল, অর্থ বিভাগ : আবদুল মালেক খান, খাদ্য বিভাগ : মহিউদ্দিন আহামেদ (এম.পি.এ), বিচার বিভাগ : আমিনুল হক চৌধুরী (এ্যাডভোকেট), ত্রাণ বিভাগ : আমির হোসেন আমু (এম.পি.এ), জ্বালানী বিভাগ  : সামছুল হক ( এম.এন.এ), তথ্য বিভাগ : ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ( এ্যাডভোকেট), সিভিল ডিফেন্স বিভাগ : হাসান ঈমাম চৌধুরী (এ্যাডভোকেট), যোগাযোগ বিভাগ : সরদার জালাল উদ্দিন (এ্যাডভোকেট), স্বাস্থ্য বিভাগ : ডাঃ হরমত আলী ও প্রধান সমন্বয়কারী হেমায়েত উদ্দিন আহামেদ (এ্যাডভোকেট)।

বীর সেনানী নূরুল আলম ফরিদ এর ভাষ্য, ২৫ শে মার্চ থেকে ২৫ শে এপ্রিল পর্যন্ত বৃহত্তর বরিশাল ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। ২৫ শে এপ্রিল পাক বাহিনী স্থল, নৌ এবং আকাশ পথে বরিশাল আক্রমন করলে আমরা বরিশাল থেকে নৌ ও সমুদ্র পথে পশ্চিম বাংলার হাসনাবাদে পৌঁছাই। সেখানে ৯ নং সেক্টর পশ্চিম বাংলার ঘাটি স্থাপন করা হয়। আমার দায়িত্ব ছিল যে সব ছাত্র, যুবক, কৃষক, জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য প্রশিক্ষন নিতে ভারত আসত, তাঁদের অভ্যর্থনা জানানো। প্রতিদিন হাজার হাজার তরুণ, যুবক নৌ ও স্থল পথে হাসনাবাদ অভ্যর্থনার ক্যাম্পে জড়ো হত। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষনের জন্য ৯ নং সেক্টরের আওতায় ৭/৮ টি প্রশিক্ষন ক্যাম্প ছিল। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আগত তরুণ যুবকদের পাঠিয়ে দিতাম। তাঁদের কাছ থেকে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের কাহিনী শুনতাম এবং কাহিনী শুনতে শুনতে শিহরিত ও কান্নায় ভেঙ্গে পড়তাম, তাই আমি চিন্তা করলাম পাক বাহিনী ও রাজাকারদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা বিশ্ববাসী সহ পাক হানাদার বাহিনীর কবলিত জনগণকে জানানো দরকার। যাতে বিশ্ববাসী এবং শত্রু কবলিত জনগণ মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে। আমি ৭১ সালের ৪ঠা আগষ্ট ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ নামে পাক্ষিক পত্রিকা বের করি।

আমাকে পত্রিকা বের করার উৎসাহ দিয়েছিল ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ হোসেন কালু, পত্রিকা প্রকাশের সর্বাত্নক সহযোগিতা করেন ভারতের ক্যাম্পাস সার্কেল সদস্যবৃন্দ। ক্যাম্পাস সার্কেলের সদস্যগণ ছিল বিভিন্ন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিত্রশিল্পী। এদের মধ্যে সত্য কাম সেন গুপ্ত, শৈলেন্দ্র বিকাশ মিত্র, দীলিপ কুমার দাস, অচিন্ত কুমার ঘোষ, অর্ধ্যকুসুম দাস গুপ্ত, সম্পাদক, সমতট পত্রিকা, পশ্চিম বঙ্গ, অধ্যাপক পরিতোষ রায় চৌধুরী, মোহামদ আব্দুল হাফিজ, বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক অধ্যাপক শ্রী রমেশ কুমার বিল্লেরে, অধ্যাপক সাহিত্যিক ও কবি বিষ্ণুদাস, কবি শ্রীমতি অনুপা চক্রবর্তী, পশ্চিম বঙ্গের সাপ্তাহিক গণবার্তার শ্রী বীরেশ ভট্রাচার্য, অধ্যাপক কবি মীরাদে, সাহিত্যিক বিষু দে, অধ্যাপক সত্যকাম সেন গুপ্ত ছিলেন বিল্পবী বাংলাদেশ পত্রিকার স্থানীয় ব্যুরো প্রধান (পশ্চিম বঙ্গ)। ২২/২৬ মনোহরপুর রোড, কলিকাতা ২৯, ফোন : ৪৭৯১৪৯। এটা ছিল কলকাতার কার্যালয়। কবি সাহিত্যিক শিক্ষাবিদরা পত্রিকা প্রকাশে সর্বরকম আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, যা ভুলবার নয়। এবং এরা বিভিন্ন সময় আমাদের সাথে ৯ নং সেক্টরের যুদ্ধ ক্ষেত্রে গিয়ে উৎসাহ ও উদ্দিপনা যোগিয়েছেন যে দেশ একদিন স্বাধীন হবে।

বিপ্লবী বাংলাদেশ এর ১ম সংখ্যা ছিল ৫ হাজার। যা হাসনাবাদে নিয়ে আসি। সে কি আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশে যাবে না। ১ম সংখ্যার পর নিয়মিত সপ্তাহিক হিসেবে বের করতে থাকি। সেই পত্রিকা মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যেত। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ ও আগ্রহে ২য় সংখ্যা থেকে সাপ্তাহিক হিসেবে বের করে থাকি। সপ্তাহে ৫ দিন একহাতে অস্ত্র এবং আরেকহাতে কলম নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিচরণ করতাম। আমার সাথে মিন্টু বসু, ভাষা সৈনিক ইউছুফ হোসেন কালু ভাই থাকত। বীরমুক্তিযোদ্ধা মিন্টু বসু পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ছিল। আমরা ৫ দিন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্র ও শরনার্থীদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতাম। সেই সংবাদ নিয়ে শুক্রবার রাতে স্ট্রেটে নিয়ে যেতাম। শনিবার পত্রিকা ছাপিয়ে রোববার সকালে হাসানাবাদে পৌঁছাতাম।

মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে পত্রিকা শত্রু কবলিত এলাকায় পাঠানো হত। এ পত্রিকার সংবাদ দাতা ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীরা। আমরা কোলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোড মুজিব নগর কার্যালয় থেকেও বাংলাদেশের সকল যুদ্ধের খবরাখবর সংগ্রহ করে বিপ্লবী বাংলাদেশে ছাপাতাম। যখন জানতাম বাংলাদেশের আনাচে কানাচে বিপ্লবী বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধারা পৌঁছে দিয়ে আবার সংবাদ সংগ্রহ করে নিয়ে আসত, তখন আমরা আশায় বুক বানতাম যে, দেশ স্বাধীন হবেই। বিপ্লবী বাংলাদেশ ছিল ৯ নং সেক্টরের মুখপত্র। এই পত্রিকা বের করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এই পত্রিকা ছিল দেশবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা। শত্রু কবলিত পাকহানাদার বাহিনী অধ্যুষিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারত, মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে এবং দেশ একদিন স্বাধীন হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে একটি পত্রিকা গোলা বারুদের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী। পত্রিকা জনগণকে প্রেরণা জোগায় এবং শত্রুর মনোবল ভেঙ্গে দেয়। বিপ্লবী বাংলাদেশ পত্রিকার আলোক চিত্রের দায়িত্বে ছিল তৌফিক ঈমাম লিপু। বিপ্লবী বাংলাদেশের ছবি এবং সংবাদ মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশী/বিদেশী সাংবাদিকরা সংগ্রহ করে প্রচার করত। এরফলে যুদ্ধের খবরাখবর দেশবাসী ও বিশ্বসবাসী জানতে পারত। আমরা যুদ্ধকালীন সময় তথ্য সংবাদ প্রচার করতাম। আমাদের উদ্দেশ্যে ছিল পত্রিকার মাধ্যমে দেশবাসীকে দেশ স্বাধীন করার জন্য অনুপ্রাণিত করা।

এদেশিয় গুটিকয়েক স্বাধীনতা বিরোধী ও স্বার্থানেষী অপতৎপরতা ও বিশ্বাস ঘাতকতার মোক্ষম সুযোগ নিয়েছিল খান সেনারা। তারা অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, ধর্ষণ ও গণহত্যার যে হোলিখেলা শুরু করেছিল তার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জন্য গড়ে উঠেছিল সেক্টর ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া যোদ্ধাদের বিজয় গাঁথা প্রচারের জন্য একদিকে যেমন প্রয়োজন ছিল সংবাদপত্রের অপরদিকে যারা অধীর আগ্রহ ও উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্যের সংবাদ ও মোক্ষম বিজয় বার্তা জানার জন্য। তাদের মনোবল চাঙ্গা ও দেশপ্রেম জাগ্রত রাখতে প্রায় অর্ধ শতাধিক পত্রপত্রিকা রণাঙ্গন থেকে প্রকাশিত হত। মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার ছিল তৎকালীন প্রকাশিত পত্রপত্রিকা। রণাঙ্গনে শপথ নিয়েছিলাম দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমি চুল, দাঁড়ি কাটবোনা, স্বাধীন দেশে ৭২ সালে আমার চুল ও দাঁড়ি কাটি। আমি আজো মুক্তিযুদ্ধের পত্রিকা নিয়ে আছি এবং থাকব। বরিশাল থেকে ৭১ সাথে বাংলাদেশ নামে একটি বুলেটিন বের হয়েছিল। সেটা শুধু এক সংখ্যা বের হয়। এর সাথে বিপ্লবী বাংলাদেশ এর কোন সম্পর্ক ছিল না। রণাঙ্গনের পত্রিকা বিপ্লবী বাংলাদেশ শুধু রণাঙ্গনের খবরই প্রকাশ করতে না, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে নানা উপকরণও সংগ্রহ করে দিতো। এজন্য সেসময় সবচেয়ে বেশী সহায়তা পেয়েছি কলকাতার স্থানীয় বুদ্ধিজীবিদের। এদের সংগঠন ছিল ক্যানভাস সার্কেল। আমরা তাঁদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যেতাম। আমাদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে তাঁরা দেখতে পেয়েছে যে, পাকবাহিনীর শত্রুদের অবস্থান জনার জন্যে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা নির্দিষ্ট দূরত্বের পর পর গাছের চুড়ায় অবস্থান করছে, যেখান থেকে শত্রুদের অবস্থান নিশ্চিত করে সংকেত দিচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে ক্যানভাস সার্কেল এর বন্ধুরা আমাকে জানায়-আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁরা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ওয়ারলেস প্রদান করতে চায়, মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা হিসেবে। ক্যানভাস সার্কেল বন্ধুরা ছিলো আরএসপির কর্মী। কলকাতায় গিয়ে আমাদের নিজ দায়িত্বে ওয়াকিটকিসহ ওয়ারলেস সেট নিয়ে আসলাম। কথা দিয়ে গিয়েছিলাম ওয়ারলেস সেট কোথা থেকে কিভাবে পেয়েছি তা কাউকে বলবোনা। ওয়ারিলেস সেট এনে ৯ নং সেক্টরের সদর দফতরে হস্তান্তর করি। তবে কথা মতো তথ্য সূত্রের কথা প্রকাশ করিনি। তারা আমাদেরকে আরও সহায়তা দিয়েছিলো। নিজেদের আঁকা ছবি দিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলো। সেখানে ছবি বিক্রি করে সংগ্রহিত অর্থ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গামবুট, কম্বলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে দিয়েছিলো। যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় এবং মুজিবনগর সরকারের অনুমতি ছাড়া কোন সাংবাদিক রণাঙ্গনের কোন এলাকা পরিদর্শন করতে পারতোনা। কিন্তু আমরা আমাদের সাথে ভারতীয় সাংবাদিকদের নিয়ে আসতাম যুদ্ধক্ষেত্রে। তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রের নানা সংবাদ সংগ্রহ করে ভারতীয় এবং অন্যান্য বিদেশী সংবাদ ও গণমাধ্যমে সরবরাহ করতো। তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও ছিত্র ধারণ করেও পাঠিয়ে দিতো বিদেশী মিডিয়ার।

বীর সেনানী নূরুল আলম ফরিদ বলেন, ১৯৭১ সালের ২৯ আগষ্ট তারিখে প্রকাশিত বিপ্লবী বাংলাদেশ এর সংখ্যার ৫ম পাতায় লিড হেডিং ‘‘ তিন মাসের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে’ শীর্ষক সংবাদে তোলপাড় শুরু হয়। সংবাদটি প্রকাশ হবার পর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম ও জি ওসমানী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে আমাকে ডেকে পাঠান। কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে সদর দফতরে গেলে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়-প্রকাশিত রিপোর্টের সূত্র কী? তবে ভবিষ্যতে এ জাতীয় কোন সংবাদ না ছাপানোর জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। প্রকাশিত সংবাদটি তৈরি করা হয়েছিলো সে সময়ের হংকংয়ের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও ট্রেড কমিশনার এর উদ্ধৃতি দিয়ে। বীর সেনানী ফরিদ বলেন, ক্যানভাসের মাধ্যমে নভেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধের চলচিত্র জয় বাংলার সুটিং হয়ে ছিলো ৯ নং সেক্টরে। নির্মিত চলচ্ছিত্রে দেখানো হয় মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে পাকবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা, নৌযান ধবংস করছে, উড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাও দেখানো হয়েছে ছবিতে। সে ছবিতে মূল ভূমিকায় ছিলাম আমি।

কোলকাতার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা হয় ছবিটি। এক রাতের ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে। আগষ্ট মাসের শেষের দিকে একরাত। তখন প্রায় দেড়টা, আমি তখন হাসনাবাদ আমার অফিসে। চাকুলিয়া ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষন শেষে ৯০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল এসেছে। বিএসএফ কমান্ডার সিফা তাদেরকে আমার হাতে তুলে দিয়ে এদেরকে আমাদের টাকি ক্যাম্পে পৌছে দিতে বললেন। সেনাবাহিনীর দু’টি ট্রাকে করে তাদের নিয়ে রওয়ানা করলাম। আমি একটি ট্রাকে আমার দাড়ি, গোফ অনেক লম্বা হয়েছে অনেকটা শিখ সম্প্রদায়ের মতো। আমাদের অপর ট্রাকের চালক ছিলেন একজন শিখ। তিনি ইশারায় আমাদের তাদের ট্রাকে ডেকে তুললেন। দু’টি ট্রাক চলছে। কিছুক্ষন পর আমাদের পেছনের ট্রাকটিকে দেখা যাচ্ছিলোনা। খোঁজ নিয়ে দেখলাম ৪৫ মুক্তিযোদ্ধার দল নিয়ে ট্রাকটি সরু রাস্তা থেকে খাদে পড়ে গেছে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা ঢাকা অঞ্চলের বলে জানতাম। আমি হয়তো বেঁচে গেছি দাড়ি ও গোফ থাকার কারণে।

বীর মুক্তিযােদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ বলেন, বিপ্লবী বাংলাদেশ এর ১৯ টি সংখ্যা মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত হয়। চতুর্থ সংখ্যা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ডায়েরী নামে কলাম লেখা হত। এই কলাম মিন্টু বসু ও আমরা লিখতাম। নাম দেওয়া হতো বিভিন্ন জনের। যাঁরা সে সময় ছিল শত্রু কবলিত এলাকায়। তবে যাঁদের নামে মুক্তিযোদ্ধা ডায়রী লেখা হয়েছিল, তাঁরা স্বাধীনতার পরবর্তীতে বিপ্লবী বাংলাদেশের সাথে সম্পূক্ত হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত ও মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করেছিল বিপ্লবী বাংলাদেশ ।
———-
লেখক : নির্বাহী ও বার্তা প্রধান, ‌রণাঙ্গনের মুখপত্র ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’’।

দৈনিক বরিশাল ২৪

মুক্তিযুদ্ধের সাহসী কলম সৈনিক একজন নুরুল আলম ফরিদ

মঙ্গলবার, মার্চ ১, ২০২২ ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

আহমেদ জালাল:: একাত্তরে বেয়নেটের ধার আর বারুদের গন্ধ গায়ে মেখে ‘বিপ্লবী  বাংলাদেশ’ পত্রিকার জন্ম মুক্তঞ্চলে। অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশে যুদ্ধের ময়দানে পাকহানাদারদের প্রতিরোধে মুক্তিযোদ্ধারা সোচ্চার, ঠিক সেই মুহূর্তে সাংস্কৃতিক শৃঙ্খল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ছিলো-‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’। রণাঙ্গনের পত্রিকা ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ সেই দিনের পশ্চিমা অনুশাসনকে ভয় পায়নি। নির্ভয়ে লেখা হয়-পাকিস্তানের স্বৈরশাসক তথা স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গির বিরূদ্ধে। এক হাতে অস্ত্র আরেক হাতে কলম, সেদিন মৃত্যুকে কেউ ভয় পায়নি। তাই ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ এর ইতিহাস স্বাধীনতা যুদ্ধেরই ইতিহাস। নূরুল আলম ফরিদ এর সম্পাদনায় প্রকাশিত সেদিনকার ‘ ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ” পত্রিকার ভূমিকা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের ‘সাপ্তাহিক ক্যাম্পাস’   মন্তব্য করেছিল- ‘৯ নম্বর সেক্টর থেকে ” ‘বিপ্লবী  বাংলাদেশ” নামে পত্রিকা স্বাধীনতা যুদ্ধে একটি দূরপাল্লার কামানের চেয়েও বেশী কাজ করেছে। ”পত্রিকা ছাপা শেষে নূরুল আলম ফরিদ ফিরে গেলেন সীমান্তের ৯ নম্বর সেক্টর ক্যাম্পে, হাসনাবাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবির, অপারেশন ক্যাম্প ও বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যখন পত্রিকাটি পৌঁছে তখন ক্যাম্পে ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ নিয়ে উল্লাস ধ্বনি শুরু হয়। পত্রিকাটি যেন তাদের কাছে একটি বিজয়ী রণক্ষেত্র। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনে যে পত্রিকার জন্ম সেই পত্রিকা ” ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ”। বহু ঘাত প্রতিঘাত করে আজও মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে সমুন্নত রেখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে ‘ ‘বিপ্লবী  বাংলাদেশ”।

যিনি একহাতে অস্ত্র, আরেক হাতে কলম নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, নাম তাঁর নূরুল আলম ফরিদ। বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ নিজের জবানবন্দীতে মুক্তযুদ্ধকালীন নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। একাত্তরে একাধিকবার সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলা করেছেন এই বীর সেনানী৷ ঈদের দিনে পারুলিয়া এলাকা শত্রুমুক্ত করেছিলেন তাঁরা৷ নূরুল আলম ফরিদ বলেন, সেদিনের কথা এখনো পরিষ্কার মনে আছে আমার৷ তাঁর ভাষ্য, ‘‘সেপ্টেম্বরের এক ঈদের দিন, সম্ভবত ২৬ সেপ্টেম্বর আমরা পারুলিয়া শত্রুমুক্ত করেছিলাম৷ সেসময় আমাদের বেশ কয়েকজন আহত হন৷ তবে শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষকে আমরা চারিদিক থেকে ঘিরে ধরতে সমর্থ হই৷ এভাবেই আমরা পারুলিয়া শত্রুমুক্ত করি৷’

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ বলেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বরিশাল পলিটেকনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সে সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আমার মেঝ ভাই ‘‘নূরুল ইসলাম মঞ্জুর’’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মার্চের ১ম সপ্তাহ থেকে বরিশালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়কারী ছিলেন ‘‘নুরুল ইসলাম মঞ্জু’’ (এম.এন.এ)। এবং আমাদের বাসা ছিল সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম। সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম থেকে বৃহত্তর বরিশালের সকল থানা ও মহাকুমার সবাইকে তথা ছাত্র, কৃষক ও জনতাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হত। বৃহত্তর বরিশাল জেলার সব এম.এন.এ ও এম.পি ও ছিল সংগ্রাম পরিষদের সদস্য।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ বলেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বরিশাল পলিটেকনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সে সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আমার মেঝ ভাই ‘‘নূরুল ইসলাম মঞ্জুর’’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মার্চের ১ম সপ্তাহ থেকে বরিশালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়কারী ছিলেন ‘‘নুরুল ইসলাম মঞ্জু’’ (এম.এন.এ)। এবং আমাদের বাসা ছিল সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম। সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম থেকে বৃহত্তর বরিশালের সকল থানা ও মহাকুমার সবাইকে তথা ছাত্র, কৃষক ও জনতাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হত। বৃহত্তর বরিশাল জেলার সব এম.এন.এ ও এম.পি ও ছিল সংগ্রাম পরিষদের সদস্য।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ বলেন, ৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনিত সব এম.এন.ও এমপিরা নির্বাচিত হয়। তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানিরা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে টালবাহানা করতে থাকে। ৭১ এর ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান বিশাল জনসভায় ইয়াইয়াকে সংসদ অধিবেশন ডাকার আহবান করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা ও সরকার গঠনের আহবান জানান। সেই দিন বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু দেশবাসিকে নির্দেশ দেন, পশ্চিম পাকিস্তান যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্থান্তর না করেন, তবে জনগণ যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যেন স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইয়াইয়া খান টালবাহানা করে সময় নিয়ে পশ্চিমা সৈন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জড়ো করে। ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যায় পশ্চিম পাকিস্তান চলে যায় ইয়াইয়া খান। সেই দিন রাত ১১ টায় পাক বাহিনী রাজারবাগ পিলখানা সহ ঢাকার শহরে ট্যাংক এবং সজোয়া বাহিনী নামিয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। রাত সাড়ে ১১টায় নোয়াখালীর এম.পি খালেদ মোহামদ আলী, নুরুল ইসলাম মঞ্জুরকে কন্ট্রোলরুমে ফোন করে জানান-পাক বাহিনী সারা শহরে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে এবং ক্ষমতা হস্থান্তর করবে না। তৎকালীন সময়ে নুরুল ইসলাম মঞ্জুর উপস্থিত এম.এন.এ ও এম.পি সবাই মিলিত হয়ে বরিশাল পুলিশ লাইন থেকে অস্ত্র এনে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার সিদ্বান্ত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাত সাড়ে তিনটায় বগুড়া রোডস্থ পেশকার বাড়ী অর্থাৎ আমাদের বাসায় পুলিশ লাইন থেকে সব অস্ত্র নিয়ে এসে ২৬ শে মার্চ সকাল ৬ টায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অস্ত্র বিতরণ করা হয়। সকাল ১০ টায় আমাদের বাসার সম্মুখে সদর গালর্স স্কুলে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্ব বৃহত্তম দক্ষিণাঞ্চলে প্রথম সচিবালয় গঠন করা হয়। বৃহত্তর বরিশালের সকল জেলা প্রশাসক, জজ এবং সব কর্মকর্তা কর্মচারীকে এ সচিবালয় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলীয় সচিবালয় এর বেসাময়িক প্রধান ছিলেন এম.এন.এ নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও সামরিক প্রধান ছিলেন মেজর এম.এ জলিল, সহ প্রধান ছিলেন ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা। এ সময় শক্তিশালী ১১ বিশিষ্ট এক কমিটি গঠন করা হয়। বেসামরিক বিভাগ : নুরুল ইসলাম মঞ্জুর (এম.এন.এ), প্রতিরক্ষা বিভাগ : মেজর এম.এ জলিল, অর্থ বিভাগ : আবদুল মালেক খান, খাদ্য বিভাগ : মহিউদ্দিন আহামেদ (এম.পি.এ), বিচার বিভাগ : আমিনুল হক চৌধুরী (এ্যাডভোকেট), ত্রাণ বিভাগ : আমির হোসেন আমু (এম.পি.এ), জ্বালানী বিভাগ  : সামছুল হক ( এম.এন.এ), তথ্য বিভাগ : ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ( এ্যাডভোকেট), সিভিল ডিফেন্স বিভাগ : হাসান ঈমাম চৌধুরী (এ্যাডভোকেট), যোগাযোগ বিভাগ : সরদার জালাল উদ্দিন (এ্যাডভোকেট), স্বাস্থ্য বিভাগ : ডাঃ হরমত আলী ও প্রধান সমন্বয়কারী হেমায়েত উদ্দিন আহামেদ (এ্যাডভোকেট)।

বীর সেনানী নূরুল আলম ফরিদ এর ভাষ্য, ২৫ শে মার্চ থেকে ২৫ শে এপ্রিল পর্যন্ত বৃহত্তর বরিশাল ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। ২৫ শে এপ্রিল পাক বাহিনী স্থল, নৌ এবং আকাশ পথে বরিশাল আক্রমন করলে আমরা বরিশাল থেকে নৌ ও সমুদ্র পথে পশ্চিম বাংলার হাসনাবাদে পৌঁছাই। সেখানে ৯ নং সেক্টর পশ্চিম বাংলার ঘাটি স্থাপন করা হয়। আমার দায়িত্ব ছিল যে সব ছাত্র, যুবক, কৃষক, জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য প্রশিক্ষন নিতে ভারত আসত, তাঁদের অভ্যর্থনা জানানো। প্রতিদিন হাজার হাজার তরুণ, যুবক নৌ ও স্থল পথে হাসনাবাদ অভ্যর্থনার ক্যাম্পে জড়ো হত। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষনের জন্য ৯ নং সেক্টরের আওতায় ৭/৮ টি প্রশিক্ষন ক্যাম্প ছিল। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আগত তরুণ যুবকদের পাঠিয়ে দিতাম। তাঁদের কাছ থেকে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের কাহিনী শুনতাম এবং কাহিনী শুনতে শুনতে শিহরিত ও কান্নায় ভেঙ্গে পড়তাম, তাই আমি চিন্তা করলাম পাক বাহিনী ও রাজাকারদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা বিশ্ববাসী সহ পাক হানাদার বাহিনীর কবলিত জনগণকে জানানো দরকার। যাতে বিশ্ববাসী এবং শত্রু কবলিত জনগণ মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে। আমি ৭১ সালের ৪ঠা আগষ্ট ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ নামে পাক্ষিক পত্রিকা বের করি।

আমাকে পত্রিকা বের করার উৎসাহ দিয়েছিল ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ হোসেন কালু, পত্রিকা প্রকাশের সর্বাত্নক সহযোগিতা করেন ভারতের ক্যাম্পাস সার্কেল সদস্যবৃন্দ। ক্যাম্পাস সার্কেলের সদস্যগণ ছিল বিভিন্ন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিত্রশিল্পী। এদের মধ্যে সত্য কাম সেন গুপ্ত, শৈলেন্দ্র বিকাশ মিত্র, দীলিপ কুমার দাস, অচিন্ত কুমার ঘোষ, অর্ধ্যকুসুম দাস গুপ্ত, সম্পাদক, সমতট পত্রিকা, পশ্চিম বঙ্গ, অধ্যাপক পরিতোষ রায় চৌধুরী, মোহামদ আব্দুল হাফিজ, বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক অধ্যাপক শ্রী রমেশ কুমার বিল্লেরে, অধ্যাপক সাহিত্যিক ও কবি বিষ্ণুদাস, কবি শ্রীমতি অনুপা চক্রবর্তী, পশ্চিম বঙ্গের সাপ্তাহিক গণবার্তার শ্রী বীরেশ ভট্রাচার্য, অধ্যাপক কবি মীরাদে, সাহিত্যিক বিষু দে, অধ্যাপক সত্যকাম সেন গুপ্ত ছিলেন বিল্পবী বাংলাদেশ পত্রিকার স্থানীয় ব্যুরো প্রধান (পশ্চিম বঙ্গ)। ২২/২৬ মনোহরপুর রোড, কলিকাতা ২৯, ফোন : ৪৭৯১৪৯। এটা ছিল কলকাতার কার্যালয়। কবি সাহিত্যিক শিক্ষাবিদরা পত্রিকা প্রকাশে সর্বরকম আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, যা ভুলবার নয়। এবং এরা বিভিন্ন সময় আমাদের সাথে ৯ নং সেক্টরের যুদ্ধ ক্ষেত্রে গিয়ে উৎসাহ ও উদ্দিপনা যোগিয়েছেন যে দেশ একদিন স্বাধীন হবে।

বিপ্লবী বাংলাদেশ এর ১ম সংখ্যা ছিল ৫ হাজার। যা হাসনাবাদে নিয়ে আসি। সে কি আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশে যাবে না। ১ম সংখ্যার পর নিয়মিত সপ্তাহিক হিসেবে বের করতে থাকি। সেই পত্রিকা মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যেত। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ ও আগ্রহে ২য় সংখ্যা থেকে সাপ্তাহিক হিসেবে বের করে থাকি। সপ্তাহে ৫ দিন একহাতে অস্ত্র এবং আরেকহাতে কলম নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিচরণ করতাম। আমার সাথে মিন্টু বসু, ভাষা সৈনিক ইউছুফ হোসেন কালু ভাই থাকত। বীরমুক্তিযোদ্ধা মিন্টু বসু পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ছিল। আমরা ৫ দিন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্র ও শরনার্থীদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতাম। সেই সংবাদ নিয়ে শুক্রবার রাতে স্ট্রেটে নিয়ে যেতাম। শনিবার পত্রিকা ছাপিয়ে রোববার সকালে হাসানাবাদে পৌঁছাতাম।

মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে পত্রিকা শত্রু কবলিত এলাকায় পাঠানো হত। এ পত্রিকার সংবাদ দাতা ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীরা। আমরা কোলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোড মুজিব নগর কার্যালয় থেকেও বাংলাদেশের সকল যুদ্ধের খবরাখবর সংগ্রহ করে বিপ্লবী বাংলাদেশে ছাপাতাম। যখন জানতাম বাংলাদেশের আনাচে কানাচে বিপ্লবী বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধারা পৌঁছে দিয়ে আবার সংবাদ সংগ্রহ করে নিয়ে আসত, তখন আমরা আশায় বুক বানতাম যে, দেশ স্বাধীন হবেই। বিপ্লবী বাংলাদেশ ছিল ৯ নং সেক্টরের মুখপত্র। এই পত্রিকা বের করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এই পত্রিকা ছিল দেশবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা। শত্রু কবলিত পাকহানাদার বাহিনী অধ্যুষিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারত, মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে এবং দেশ একদিন স্বাধীন হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে একটি পত্রিকা গোলা বারুদের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী। পত্রিকা জনগণকে প্রেরণা জোগায় এবং শত্রুর মনোবল ভেঙ্গে দেয়। বিপ্লবী বাংলাদেশ পত্রিকার আলোক চিত্রের দায়িত্বে ছিল তৌফিক ঈমাম লিপু। বিপ্লবী বাংলাদেশের ছবি এবং সংবাদ মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশী/বিদেশী সাংবাদিকরা সংগ্রহ করে প্রচার করত। এরফলে যুদ্ধের খবরাখবর দেশবাসী ও বিশ্বসবাসী জানতে পারত। আমরা যুদ্ধকালীন সময় তথ্য সংবাদ প্রচার করতাম। আমাদের উদ্দেশ্যে ছিল পত্রিকার মাধ্যমে দেশবাসীকে দেশ স্বাধীন করার জন্য অনুপ্রাণিত করা।

এদেশিয় গুটিকয়েক স্বাধীনতা বিরোধী ও স্বার্থানেষী অপতৎপরতা ও বিশ্বাস ঘাতকতার মোক্ষম সুযোগ নিয়েছিল খান সেনারা। তারা অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, ধর্ষণ ও গণহত্যার যে হোলিখেলা শুরু করেছিল তার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জন্য গড়ে উঠেছিল সেক্টর ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া যোদ্ধাদের বিজয় গাঁথা প্রচারের জন্য একদিকে যেমন প্রয়োজন ছিল সংবাদপত্রের অপরদিকে যারা অধীর আগ্রহ ও উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্যের সংবাদ ও মোক্ষম বিজয় বার্তা জানার জন্য। তাদের মনোবল চাঙ্গা ও দেশপ্রেম জাগ্রত রাখতে প্রায় অর্ধ শতাধিক পত্রপত্রিকা রণাঙ্গন থেকে প্রকাশিত হত। মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার ছিল তৎকালীন প্রকাশিত পত্রপত্রিকা। রণাঙ্গনে শপথ নিয়েছিলাম দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমি চুল, দাঁড়ি কাটবোনা, স্বাধীন দেশে ৭২ সালে আমার চুল ও দাঁড়ি কাটি। আমি আজো মুক্তিযুদ্ধের পত্রিকা নিয়ে আছি এবং থাকব। বরিশাল থেকে ৭১ সাথে বাংলাদেশ নামে একটি বুলেটিন বের হয়েছিল। সেটা শুধু এক সংখ্যা বের হয়। এর সাথে বিপ্লবী বাংলাদেশ এর কোন সম্পর্ক ছিল না। রণাঙ্গনের পত্রিকা বিপ্লবী বাংলাদেশ শুধু রণাঙ্গনের খবরই প্রকাশ করতে না, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে নানা উপকরণও সংগ্রহ করে দিতো। এজন্য সেসময় সবচেয়ে বেশী সহায়তা পেয়েছি কলকাতার স্থানীয় বুদ্ধিজীবিদের। এদের সংগঠন ছিল ক্যানভাস সার্কেল। আমরা তাঁদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যেতাম। আমাদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে তাঁরা দেখতে পেয়েছে যে, পাকবাহিনীর শত্রুদের অবস্থান জনার জন্যে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা নির্দিষ্ট দূরত্বের পর পর গাছের চুড়ায় অবস্থান করছে, যেখান থেকে শত্রুদের অবস্থান নিশ্চিত করে সংকেত দিচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে ক্যানভাস সার্কেল এর বন্ধুরা আমাকে জানায়-আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁরা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ওয়ারলেস প্রদান করতে চায়, মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা হিসেবে। ক্যানভাস সার্কেল বন্ধুরা ছিলো আরএসপির কর্মী। কলকাতায় গিয়ে আমাদের নিজ দায়িত্বে ওয়াকিটকিসহ ওয়ারলেস সেট নিয়ে আসলাম। কথা দিয়ে গিয়েছিলাম ওয়ারলেস সেট কোথা থেকে কিভাবে পেয়েছি তা কাউকে বলবোনা। ওয়ারিলেস সেট এনে ৯ নং সেক্টরের সদর দফতরে হস্তান্তর করি। তবে কথা মতো তথ্য সূত্রের কথা প্রকাশ করিনি। তারা আমাদেরকে আরও সহায়তা দিয়েছিলো। নিজেদের আঁকা ছবি দিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলো। সেখানে ছবি বিক্রি করে সংগ্রহিত অর্থ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গামবুট, কম্বলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে দিয়েছিলো। যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় এবং মুজিবনগর সরকারের অনুমতি ছাড়া কোন সাংবাদিক রণাঙ্গনের কোন এলাকা পরিদর্শন করতে পারতোনা। কিন্তু আমরা আমাদের সাথে ভারতীয় সাংবাদিকদের নিয়ে আসতাম যুদ্ধক্ষেত্রে। তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রের নানা সংবাদ সংগ্রহ করে ভারতীয় এবং অন্যান্য বিদেশী সংবাদ ও গণমাধ্যমে সরবরাহ করতো। তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও ছিত্র ধারণ করেও পাঠিয়ে দিতো বিদেশী মিডিয়ার।

বীর সেনানী নূরুল আলম ফরিদ বলেন, ১৯৭১ সালের ২৯ আগষ্ট তারিখে প্রকাশিত বিপ্লবী বাংলাদেশ এর সংখ্যার ৫ম পাতায় লিড হেডিং ‘‘ তিন মাসের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে’ শীর্ষক সংবাদে তোলপাড় শুরু হয়। সংবাদটি প্রকাশ হবার পর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম ও জি ওসমানী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে আমাকে ডেকে পাঠান। কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে সদর দফতরে গেলে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়-প্রকাশিত রিপোর্টের সূত্র কী? তবে ভবিষ্যতে এ জাতীয় কোন সংবাদ না ছাপানোর জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। প্রকাশিত সংবাদটি তৈরি করা হয়েছিলো সে সময়ের হংকংয়ের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও ট্রেড কমিশনার এর উদ্ধৃতি দিয়ে। বীর সেনানী ফরিদ বলেন, ক্যানভাসের মাধ্যমে নভেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধের চলচিত্র জয় বাংলার সুটিং হয়ে ছিলো ৯ নং সেক্টরে। নির্মিত চলচ্ছিত্রে দেখানো হয় মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে পাকবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা, নৌযান ধবংস করছে, উড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাও দেখানো হয়েছে ছবিতে। সে ছবিতে মূল ভূমিকায় ছিলাম আমি।

কোলকাতার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা হয় ছবিটি। এক রাতের ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে। আগষ্ট মাসের শেষের দিকে একরাত। তখন প্রায় দেড়টা, আমি তখন হাসনাবাদ আমার অফিসে। চাকুলিয়া ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষন শেষে ৯০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল এসেছে। বিএসএফ কমান্ডার সিফা তাদেরকে আমার হাতে তুলে দিয়ে এদেরকে আমাদের টাকি ক্যাম্পে পৌছে দিতে বললেন। সেনাবাহিনীর দু’টি ট্রাকে করে তাদের নিয়ে রওয়ানা করলাম। আমি একটি ট্রাকে আমার দাড়ি, গোফ অনেক লম্বা হয়েছে অনেকটা শিখ সম্প্রদায়ের মতো। আমাদের অপর ট্রাকের চালক ছিলেন একজন শিখ। তিনি ইশারায় আমাদের তাদের ট্রাকে ডেকে তুললেন। দু’টি ট্রাক চলছে। কিছুক্ষন পর আমাদের পেছনের ট্রাকটিকে দেখা যাচ্ছিলোনা। খোঁজ নিয়ে দেখলাম ৪৫ মুক্তিযোদ্ধার দল নিয়ে ট্রাকটি সরু রাস্তা থেকে খাদে পড়ে গেছে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা ঢাকা অঞ্চলের বলে জানতাম। আমি হয়তো বেঁচে গেছি দাড়ি ও গোফ থাকার কারণে।

বীর মুক্তিযােদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ বলেন, বিপ্লবী বাংলাদেশ এর ১৯ টি সংখ্যা মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত হয়। চতুর্থ সংখ্যা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ডায়েরী নামে কলাম লেখা হত। এই কলাম মিন্টু বসু ও আমরা লিখতাম। নাম দেওয়া হতো বিভিন্ন জনের। যাঁরা সে সময় ছিল শত্রু কবলিত এলাকায়। তবে যাঁদের নামে মুক্তিযোদ্ধা ডায়রী লেখা হয়েছিল, তাঁরা স্বাধীনতার পরবর্তীতে বিপ্লবী বাংলাদেশের সাথে সম্পূক্ত হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত ও মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করেছিল বিপ্লবী বাংলাদেশ ।
———-
লেখক : নির্বাহী ও বার্তা প্রধান, ‌রণাঙ্গনের মুখপত্র ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’’।

প্রকাশক: মোসাম্মাৎ মনোয়ারা বেগম। সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: ইঞ্জিনিয়ার জিহাদ রানা। সম্পাদক : শামিম আহমেদ যুগ্ন-সম্পাদক : মো:মনিরুজ্জামান। প্রধান উপদেষ্টা: মোসাম্মৎ তাহমিনা খান বার্তা সম্পাদক : মো: শহিদুল ইসলাম ।
প্রধান কার্যালয় : রশিদ প্লাজা,৪র্থ তলা,সদর রোড,বরিশাল।
সম্পাদক: 01711970223 বার্তা বিভাগ: 01764- 631157
ইমেল: sohelahamed2447@gmail.com
  সড়ক দুর্ঘটনায় বরিশালের সাংবাদিক মাসুদ রানা নিহত   ডিসির পাশে মুক্তিযোদ্ধা ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সম্মানে আসন   ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে তর্ক, বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন   রিচার্লিসনের অবিশ্বাস্য গোলে ব্রাজিলের উড়ন্ত সূচনা   ইনজুরিতে নেইমার?   দেশের শ্রেষ্ট জেলা প্রশাসক পদক পেলেন বরিশালের ডিসি জসিম উদ্দিন হায়দার   শেয়ার দিন, ছোট্ট শিশু আয়াত কে খুঁজে পেতে সহায়তা করুন   একজন সচেতন অভিভাবক ছিলেন আনিসুর রহমান   বরিশালে ৩ বিড়ালের নাম হলো শাকিব খান, অপু বিশ্বাস, বুবলী   চট্টগ্রামে বিএনপির গণ-সমাবেশে জনস্রোত   নর্থ বেঙ্গল কিন্ডারগার্টেন এন্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুল সোসাইটির শিক্ষক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত   বরিশালের শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী সমাজকর্মী হলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ফারজানা ওহাব   ঢাকা-বরিশাল রুটে বিমান সার্ভিস বন্ধের ষড়যন্ত্র!   যাত্রী সংকটে বন্ধ হলো ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার   বাবুগঞ্জ বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি   শেরপুরে স্কুল ছাত্রের সাইকেল চুরি, কিনে দিলেন এসপি কামরুজ্জামান   বরিশালে জাপায় সংঘর্ষঃ ব্যানারে রওশনের ছবি ব্যবহারই মূল কারণ   সমাজ সেবায় অবদান রাখায় গুণীজন সম্মাননা পেলেন অধ্যক্ষ তাহমিনা আকতার   দেশবাসীর প্রশংসায় ভাসছেন খুদে হাফেজ তাকরিম   বরিশালে জাপার কো-চেয়ারম্যানের সামনেই দুই পক্ষের সংঘর্ষ জেলা সাংগঠনিক সভা পন্ড