ইকবাল হোসেন তাপসঃ

করোনা সংক্রামণ প্রতিদিন যখন তার নিজের রেকর্ড ভেঙ্গে ক্রমাগত সামনের দিকে এগিয়ে চলছে ঠিক তখনই আমারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে লক ডাউন তুলে নিচ্ছি।করোনা আক্রমণের প্রথম সারির দেশ গুলতে করোনা আক্রমন ক্রমাগত কমের দিকে হয়ত সেই বিবেচনায় তারা লক ডাউন শিথিল করছেন ।

আমাদের করোনা সংক্রামণের ঊর্ধ্বাবস্থায় লক ডাউন তুলে নেয়ার পিছনে হয়ত সরকারের ভিন্ন কোন যুক্তি থাকতে পারে। ৩১ শে মে’র পরে খুলে যাচ্ছে অফিস আদলত সাধারন পরিবহন।সামাজিক দূরত্ব মেনে চলবে সাধারন পরিবহন ও অফিস আদালত।

যে জাতি মাস্ক পকেটে নিয়ে হাটে, বাজার করার জন্য হুমড়ি খেয়ে পরে তাদেরকে স্বাস্থ্য বিধি আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে বলা মানে অন্ধকে বাতি দান করার মত।

আজ থেকে ত্রিশ বছর পূর্বে জাপানে দেখেছি মানুষ সাধারন সর্দি জ্বর হলেই মুখে মাস্ক পরেন কোন নির্দেশনা মানতে নয় নিজ দায়িত্ব বোধ থেকে মাস্ক পরছেন যাতে অন্য মানুষ আক্রান্ত না হয়। আর আজকের এই মাহামারির মধ্যে মাস্ক পকেটে নিয়ে যে জাতি ঘুরে তারা মানবে সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্য বিধি এমনটা যারা ভাবছেন তারা বেশিরভাগ জনগণকে বোকা বানাচ্ছেন।

করোনা পরিস্থিতির আজকের হিসেব মতে গড় সংক্রমণের হার ২২.৯৪% জন। সংক্রামিতের মারা যাওয়ার হার ১.৩৬% জন। এই হিসাব অনুযায়ী আমারা ধরে নিতে পারি আমাদের আশপাশের একশত জনের মধ্যে প্রায় ২৩ জন মানুষ করনা ভাইরাস বহন করছেন। অর্থাৎ আগামি ১লা জুন থেকে লঞ্চ,বাস, উড়োজাহাজে করে শত শত করোনা ভাইরাস এখানে সেখানে ভ্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছে। ধরে নিলাম ষোল কোটি মানুষের মধ্যে পঞ্চাশ লক্ষ লোকের করোনা টেস্ট করা হল ।

আক্রান্তের বর্তমান হার অনুযায়ী ১১লাখ ৪৭ হাজার করোনা রোগী পাওয়া যেতে পারে। এঁর মধ্যে বর্তমান মারা যাওয়ার হার অনুযায়ী প্রায় ১৬ হাজার মানুষ মারা যেতে পারেন। যদি সরকার এমন ভেবে থাকেন যে মানুষ মরো দেশ বাঁচাও অর্থনীতি বাঁচাও তাহলে সেই কোরবানির মধ্যে আমার আপনার আমাদের আপনাদের কার নাম যুক্ত হবে সেটা নির্ভর করবে ডারউইনের “Survival of the Fittest” থিউরির উপর।

যারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন তাদেরই সুস্থ ও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। এখন মানা না মানা, সাবধানে থাকা না থাকা সবই আমাদের নিজেদের উপর। কাজের তাগিতে আমাকে প্রায় বাহিরে যেতে হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই বেড় হই। আমার দেখা বাস্তবতা হল যারা ঘড়ে বসে আছেন তারাই সচেতন আর যারা বাহিরে বেড় হচ্ছেন তাদের বেশীরভাগেরই করোনার ভয় ভেঙ্গে অসচেতন হয়ে যাচ্ছেন।

বাঙ্গালী খুব আবেগি/হুজুগি কোন কিছু শুরু হলে সেটা নিয়ে দুএকদিন খুব মাতামাতি করি । আমাদের দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার ঘাটতি আছে। লকডাউন শুরু হওয়ার প্রথম দিকের ঘটনা আমি টাকা উত্তলনের জন্য একটি ATM বুথে গিয়েছিলাম। আমি বুথে ঢুকব ঠিক সেই মুহূর্তে গার্ড ম্যান একরকম ধমকের সুরেই আমার দিকে স্যানিটাইজার দেখিয়ে বললেন হাত পরিষ্কার করে নেন ।

আমি একটু অপ্রস্তুত হলেও অখুশি হই নাই। এর পরেও সেই বুথে ৩/৪ বার গিয়েছি কিন্তু স্যানিটাইজারের দেখা আর পাই নাই। এটা কোন ব্যাংক বা বুথের চরিত্র নয় এটা আমাদের গোটা সমাজ ও প্রশাসন ব্যাবস্থার সমস্যা। গোটা সমাজটাকে এবং আমাদের চরিত্রটাকে যেন কভিডে ধরেছে।

এখান থেকে বাঁচতে হলে সমাজটাকে বাঁচাতে হলে আমাদের যারযার অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। গতকাল এক বন্ধুকে ফোন করেছিলাম তার খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য। কথকপোনের একপর্যায় তিনি বললেন ভাই বাঙ্গালীর চরিত্রটাই হল কভিট চরিত্র এই জাতিকে শৃঙ্খলায় আনা খুব সহজ নয়। তার সাথে কথা শেষ করার পরে বাংলায় একটা নতুন শব্দের আবিস্কার করলাম।

বাঙালি নিয়ে নানান মজার মজার প্রচলিত বাক্য আছে। আজ মনে হল আর একটা নতুন শব্দ যোগ করা যেতে পারে কোভিড চরিত্র । বন্ধুর সাথে আলাপ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি একজন কভিড চরিত্রের মানুষের সন্ধান পেলাম ।

আমাদের গ্রামে একজন মানুষ ছিলেন যিনি বহু বছর পূর্বেই গত হয়েছেন। আমার বন্ধুর মতামত অনুযায়ী বাঙ্গালীর চরিত্র যদি কভিডের মতই হয় তাহলে তিনিই হবেন আমার ছোট বেলায় দেখা প্রথম কোভিড চরিত্রের মানুষ। তার আচার আচরণ সব কিছুই ছিল অদ্ভুত , খুব মিষ্টভাষী, সুচারু বুদ্দিমান,সুচ হয়ে ঢুকা আর ফাল হয়ে বেড় হওয়া ছিল তার স্বভাব।

কোন পরিবার যদি তার কবলে পরতেন তাহলে সেই পরিবার একেবারে শেষ। ভাইয়ে ভাইয়ে আইসুলেসন, একজন আরেকজনের সাথে দেখা সাক্ষাত বন্ধ , এমনকি জানাজায় যাওয়াও বন্ধ। ঠিক যেন আমাদের বর্তমানের COVID-19 এর মতো ।

আমাদের সেই কভিড ম্যান অবস্থা ও সময় বুঝে রুপ বদলাতে পারতেন আর সুযোগ বুঝে মানুষের দুর্বলতা দেখে ঢুকে পরতেন তার পরিবারের মধ্যে। তার প্রধান টার্গেট ছিল দুর্বল ধরনের মানুষ বা পরিবার গুলো। ঠিক আজকের করোনা ভাইরসের মত। করোনা যেমন আমাদের অসচতেন দুর্বল সময় গুলতে আমাদের আক্রমণ করে ফেলতে পারে।

আমারা যখন মাস্ক পরে ঘুরছি করোনা তখন আমাদের হাতের দিকে টার্গেট আবার যখন হাত মোজা পরে ঘুরছি করোনা তখন আমাদের চোখ টার্গেট করে আছে। করোনা যখন কোন ভাবেই আপনাকে ধরতে পারছেনা তখন সে আপনাকে বাজারে খুজবে, অফিসে খুজবে, বাসে, লঞ্চে, উড়োজাহাজে খুজবে।

আপনার আমার বিন্দু মাত্র দুর্বলতা পাওয়া মাত্র ধরে ফেলবে। আমার গ্রামের কভিড ম্যানের একটা স্বভাব ছিল সে শক্ত মানুষদের এড়িয়ে চলত। ঠিক আজকের করোনার মত আমরা যে যত সাবধান ও সচেতন থাকবো COVID-19 ততোই আমাদের থেকে দূরে থাকবে। তাই আসুন আমরা কভিড চরিত্রের মানুষ না হয়ে COVID-19 প্রতিরোধ করি নিজে বাঁচি দেশ বাচাই।

লেখকঃ ইকবাল হোসেন তাপস, যুগ্ন-মহাসচিব, জাতীয় পার্টি।