অনলাইন নিউজঃ ঢাকার তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের বড় একটি অংশের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল সন্তানদের নিরাপত্তা ও পরিচর্যা। সেই চাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে শুরু করেছে কর্মপরিবেশ, বাড়ছে মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা।

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক কল্যাণ, শিশু পরিচর্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় এমনই চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ডে-কেয়ার সেন্টার, শিশু শিক্ষার সুযোগ এবং মানসিক সহায়তা কার্যক্রম চালুর পর শ্রমিক সন্তুষ্টি প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে কমেছে মানসিক চাপ, বেড়েছে কাজের প্রতি মনোযোগ এবং উৎপাদনশীলতা।মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় সংলাপ অন দ্য রাইটস অ্যান্ড ওয়েল-বিইং অব আরএমজি ওয়ার্কার্স অ্যান্ড দেয়ার চিলড্রেন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই গবেষণা জরিপ উপস্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এডুকো বাংলাদেশ এবং সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশন, আর অর্থায়ন করেছে ম্যাঙ্গো। এতে শ্রম অধিকারকর্মী, শিল্পমালিক, সরকারি প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।অনুষ্ঠানে জানানো হয়, উদ্যোগগুলো শুধু সামাজিক সহায়তা নয়, বরং সরাসরি উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের মধ্যে কর্মস্থলে স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, ডে-কেয়ার সুবিধা চালুর ফলে শ্রমিকদের কাজের সময় সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে তারা এখন কাজে বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন। আগে যেখানে অনেক শ্রমিক নিয়মিত মানসিক চাপে ভুগতেন, সেখানে এখন সেই চাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানানো হয়।সন্তানের নিরাপত্তাই বদলে দিচ্ছে শ্রমিকের কর্মজীবন

তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, যাদের বড় অংশ নারী। তাদের জন্য কাজের সময় সবচেয়ে বড় মানসিক বোঝা হলো সন্তান কোথায় আছে, নিরাপদ আছে কি না—এই প্রশ্ন।

সংলাপে উপস্থাপিত গবেষণায় বলা হয়, ডে-কেয়ার ও শিশু শিক্ষাকেন্দ্র চালুর আগে অনেক শ্রমিককে কাজের সময় বারবার বাড়ির খোঁজ নিতে হতো, কেউ কেউ মানসিক অস্থিরতায় ভুগতেন। কিন্তু নিরাপদ পরিচর্যা ব্যবস্থা চালুর পর এই উদ্বেগ অনেকটাই কমে এসেছে।

গবেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তন সরাসরি শ্রমিকের কাজের মনোযোগ, উপস্থিতি এবং মানসিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলছে।

প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে শ্রমিক সন্তুষ্টি, বেড়েছে উৎপাদনশীলতা

স্মাইল প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ডে-কেয়ার, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক সহায়তা কার্যক্রম চালুর পর শ্রমিক সন্তুষ্টি ৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে শ্রম অধিকার বিষয়ে সচেতনতা ৫৯ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, শ্রমিকদের এই পরিবর্তন শুধু অনুভূতির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং কাজের গুণগত মানেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯৫ শতাংশ কারখানা ব্যবস্থাপনা জানিয়েছে, শ্রমিকদের উপস্থিতি, মনোযোগ এবং কাজের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ব্যবস্থাপকরা জানান, আগে যেখানে পারিবারিক দুশ্চিন্তার কারণে মাঝে-মধ্যে মনোযোগে ঘাটতি দেখা দিত, এখন সেই সমস্যা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে উৎপাদন লাইন আরো ধারাবাহিকভাবে চলছে।

একই সঙ্গে শ্রমিকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। তারা এখন নিজেদের সমস্যা ও উদ্বেগ ব্যবস্থাপনার কাছে তুলতে আগের তুলনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।

মানসিক সুস্থতা এখন উৎপাদনের অংশ : বিশেষজ্ঞ মতামত

গবেষণা উপস্থাপন করেন এইচ-অ্যান্ড-এইচ রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সির প্রধান নির্বাহী ইরফাত আরা ইভা। তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাতে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্যকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এটি উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

তার ভাষায়, ‘ডে-কেয়ার, শিশু শিক্ষা এবং মানসিক সহায়তা কার্যক্রম চালুর পর আমরা দেখেছি শ্রমিকদের উদ্বেগ অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা এখন কাজের সময় মানসিকভাবে অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকছেন, যার প্রভাব পড়ছে তাদের কাজের গুণগত মানে।’ তিনি আরো বলেন, শ্রমিকদের মানসিক চাপ কমানো মানে শুধু মানবিক সুবিধা নয়, এটি সরাসরি শিল্পের দক্ষতা বৃদ্ধির একটি কৌশল।

এডুকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল হামিদ বলেন, শ্রমিক ও তাদের সন্তানের কল্যাণে বিনিয়োগকে এখন আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ডে-কেয়ার বা শিশু শিক্ষাকেন্দ্র কেবল সহায়তা কর্মসূচি নয়, এটি একটি টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তি।

তিনি উল্লেখ করেন, ‘শ্রমিক যদি মানসিকভাবে স্বস্তিতে না থাকে, তাহলে উৎপাদনশীলতা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। তাই এই বিনিয়োগকে সামাজিক দায়িত্ব নয়, উন্নয়ন কৌশল হিসেবে দেখতে হবে।’

শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত সময়ের দাবি

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, শ্রমিকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, এককভাবে সরকার, শিল্পমালিক বা উন্নয়ন সংস্থার পক্ষে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘এই ধরনের ভালো উদ্যোগগুলোকে সীমিত পরিসরে না রেখে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে আরো বেশি শ্রমিক এর সুবিধা পেতে পারেন।’

এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিকেএমইএর পরিচালক ইমরান কাদের তুর্জো, জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নাঈমুল আহসান জুয়েল এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রতিনিধি মো. মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের দাম বা মান দেখছে না, বরং শ্রমিকদের কল্যাণ ও কর্মপরিবেশও মূল্যায়নের অংশ হয়ে উঠেছে।

তাদের মতে, শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বেগম বলেন, শ্রমিক ও তাদের সন্তানের কল্যাণকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।