অনলাইন নিউজ: বরিশালের বাকেরগঞ্জে গতকাল সোমবার যে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা কোনো ককটেল ছিল না। ঢাকা থেকে যাওয়া পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল টিমের প্রাথমিক তদন্তে এই বিস্ফোরণে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বিস্ফোরকটি সক্রিয় করতে ‘বুবি ট্র্যাপ’(বিস্ফোরণ ফাঁদ) ব্যবহার করা হয়েছিল।
বরিশাল জেলা পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ওই সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরিশাল অঞ্চলে এ ধরনের আইইডি বিস্ফোরণ বা উদ্ধার হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ফলে ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
গতকাল সকালে বাকেরগঞ্জ উপজেলার ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ গ্রামে স্থানীয় মৃত শাহ আলম হাওলাদারের বাড়িতে বিস্ফোরণে তাঁর স্ত্রী হনুফা বেগম (৫৫), মেয়ে ইতি আক্তার (১৮) ও নাতি ফাহিম (১৫) গুরুতর দগ্ধ হন। তাঁদের প্রথমে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর গতকাল গভীর রাতে ঢাকা থেকে সিটিটিসির বিশেষ বোম্ব ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে বিস্ফোরণের স্থান পরিদর্শন করে এবং বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
বরিশালের পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, এটি হাতে তৈরি আইইডি ছিল। এতে ইলেকট্রনিক সার্কিট ও পেট্রল ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কোনো স্প্লিন্টার পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলের আলামত পরীক্ষা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি দড়ি ‘ট্রিগার’ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি দড়ির এক প্রান্তে তিনটি লাল চিপসের প্যাকেট এবং অন্য প্রান্তে একটি শপিং ব্যাগ বাঁধা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, পথচারী বা বাড়ির সদস্যদের কৌতূহল সৃষ্টি করে সেটি নাড়াচাড়া করানোর উদ্দেশ্যেই এভাবে রাখা হয়েছিল।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরিশালের ঘটনাটি ছিল একধরনের বিস্ফোরণ ফাঁদ বা ‘বুবি ট্র্যাপ’। অর্থাৎ দেখতে নিরীহ বা আকর্ষণীয় কোনো বস্তুর সঙ্গে এমনভাবে বিস্ফোরক সংযুক্ত করা হয়, যাতে সেটি স্পর্শ বা সরানোর চেষ্টা করলেই বিস্ফোরণ ঘটে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঘটনাস্থলের আলামত এ ধরনের কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
কেন ঘটনাটি গুরুত্ব পাচ্ছে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এটিকে কোনো সাধারণ বিস্ফোরণের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কারণ, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, বিস্ফোরণের ধরন এবং বিস্ফোরক স্থাপনের কৌশল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আইইডিটি পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত ও স্থাপন করা হয়েছিল।পরিবারের সঙ্গে কারও জমিসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে কি না, সম্প্রতি দেশের কয়েকটি স্থানে বোমা পেতে রাখার ঘটনার সঙ্গে এ ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না এবং আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি কোনো নাশকতার পরিকল্পনার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ কারণে স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে তদন্তে যুক্ত করা হয়েছে। তারা বিস্ফোরকের অবশিষ্টাংশ ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল পরীক্ষা শেষে এলাকাকে নিরাপদ ঘোষণা করা হয়েছে।
ফরেনসিক পরীক্ষার পর বিস্ফোরকে ব্যবহৃত উপাদান, এর প্রকৃতি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানা যাবে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট ও সংগঠিত গোষ্ঠীর কাজ কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এর পেছনে বিস্ফোরক বিষয়ে জ্ঞান থাকা কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রত্যন্ত একটি গ্রামে এ ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনার নেপথ্যে কী আছে, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
বরিশালের পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা তিনটি দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছি। পরিবারের সঙ্গে কারও জমিসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে কি না, সম্প্রতি দেশের কয়েকটি স্থানে বোমা পেতে রাখার ঘটনার সঙ্গে এ ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না এবং আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি কোনো নাশকতার পরিকল্পনার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
যেভাবে ঘটল বিস্ফোরণ
বিস্ফোরণে আহত হওয়া বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধলমৌ গ্রামে তরুণী ইতি আক্তার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, গতকাল সকাল ছয়টার দিকে বাড়ির উঠানে ভাগনেকে ব্যায়াম করাচ্ছিলেন। তখন একটি দড়ির সঙ্গে বাঁধা তিনটি লাল রঙের চিপসের প্যাকেট দেখতে পান। কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে দেখেন, দড়ির অন্য পাশে একটি কাপড়ের শপিং ব্যাগ বাঁধা। বিষয়টি কী, তা দেখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আগের রাতের বৃষ্টির কারণে উঠান কর্দমাক্ত থাকায় পা পিছলে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। পায়ে আগুন ধরে যায়। পাশে থাকা মা ও ভাগনের শরীরেও আগুন লাগে। পরে আতঙ্কে পাশের তুলাতলা নদীতে ঝাঁপ দেন তাঁরা।
দুধলমৌ গ্রামের বাসিন্দা আল আমিন সিকদার বলেন, ‘বিকট শব্দ শুনে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, শাহ আলম হাওলাদারের পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়েছেন।’
গ্রামে আতঙ্ক
আজ সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটিতে পুলিশের পাহারা রয়েছে। বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়া ইতি আক্তারের ভাই জামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। দিনমজুরি করে সংসার চালাই। এখন মা ও বোন ঢাকায় চিকিৎসাধীন। পুলিশ বাড়িতে পাহারা দিচ্ছে। কাজে যেতে পারছি না।’
জামালের স্ত্রী তানজিলা আক্তার বলেন, ‘শাশুড়ি, ননদ ও ভাগনের অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তুলাতলা নদীতীরের এই গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, তাঁদের এলাকায় আগে কখনো এমন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি।
বিস্ফোরণের ঘটনায় গতকাল গভীর রাতে বাকেরগঞ্জ থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা হয়েছে।
বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আদিল হোসেন জানান, এ ঘটনায় কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। তদন্ত চলছে।তথ্যসূত্র:প্রথম আলো