মনিরুজ্জামান (সোহেল আহমেদ),দৈনিক বরিশাল ২৪.কম: তখন আমরা ৭ম শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলের পড়া শিখতে হলে একজন প্রাইভেট শিক্ষকের প্রয়োজন। বাসায় স্কুলের কোন বিষয়ের পড়া শিখিয়ে দেয়ার মত কেউ ছিলো না। বিশেষ করে ইংরেজী ও গনিতে আমরা সবাই কমবেশি কাঁচা ছিলাম।
ক্লাসে সবাই যখন পড়া শিখে আসত আমরা তখন নিরব দর্শক। আমাদের পড়া শেখা হতনা। পড়া না শিখে স্কুলে আসার অপরাধে স্যার আমাদের শাস্তি দিতেন। জিজ্ঞেস করতেন পড়া না পারার কারণ কি?
স্যার আমাদের যত কঠিন শাস্তি দিতেন রাগ করতামনা। কিন্তু আমাদেরর ওপর শাস্থি দেখে সহপাঠিরা হাসি ঠাট্টা করত। আর তাদের এসব দেখেি আমরা নিজেদের দারুণ অপমান বোধ করতাম। কয়েকদিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করলাম। অভিভাবককে জানালাম।
দরিদ্রতার অযুহাতে প্রাইভেট পড়ানো সম্ভব নয় বলে তারা জানিয়ে দিলেন। আমার মত রোজিনা, রাসেল, নিশা, এশা, তিশা, রিফাত,মেহেদী সহ নাম না জানা আরও অনেক শিক্ষার্থীদের একই অবস্থা। একদিন মাঠে ফুটবল খেলছিলাম। দৌড়ে এসে আমাকে ধরলেন। ভয়ে তখন বাকরুদ্ধ হয়ে পরেছিলাম। স্যার জিজ্ঞেস করলেন স্কুলে যাচ্ছিনা কেনো? এবার আর বলতে দ্বিধা করলামনা।
পড়া না পারা সহ পরিবারের নানা সমস্যার কথা অকপটে বলতে শুরু করলাম। স্যার মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপরে ধমক দিয়ে বললেন,এসমস্যা আগে আমায় বলনি কেনো? তিনি তার প্রাইভেটে পড়তে যাওয়ার জন্য আদেশ দিলেন। স্যারের কথার বিরুদ্ধে একটুও যেতে পারলামনা।
আমরা সবাই পরদিন থেকে স্যারের কছে পড়তে গেলাম। পরিবর্তন এসেছে আমাদের মেধার। এখন আর স্কুলে ক্লাসে পড়া না শাস্তির কারণে দাড়াতে হয়না। মুসা স্যার এখন আর শাস্তি দেননা। নাছিমা আপা এখনতো বকা দেয়াই ভুলে গেছেন। হাসি ঠাট্টা করা বন্ধুরা এখন হাসির বদলে আমাদের সাথে মেধার যাচাইয়ে প্রথম ১০ এর মধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। অত:পর আমরা এখন স্কুলের নিয়মিত শিক্ষার্থী ও প্রতিদিন নিয়মীত পড়া শিখে আসতে পারছি।
শিক্ষা জীবনে প্রায় ঝড়ে যাওয়ার হাত থেকে আমাদের সে দিন খেলার মাঠে দৌড়ে গিয়ে পড়ার সুযোগ করেছিলেন যে মহান ব্যক্তি তিনিই হলেন আমাদের মামুন স্যার। আবু আহমেদ আল মামুন। এলাকায় তিনি মামুন মাস্টার হিসেবে জনপ্রিয়।
বরিশাল সদর উপজেলার ২নং কাশিপুর ইউনিয়নের লাখুটিয়া গ্রামের প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব মাস্টারের বড় পুত্র মামুন মাস্টার। বাবার শিক্ষকতায় নিজেও একই পেশায় প্রতিষ্ঠিত হবেন এমন লক্ষ্য নিয়ে পড়াশুনা করতে থাকেন।
ছাত্রজীবনে নাটক সঙ্গীত সহ খেলার মাঠের নিয়মিত সদস্য মামুন স্যার। বিনোদন প্রেমী জাগ্রত একজন ব্যক্তিত্ব মামুন স্যার। পরস্পরের প্রতি আচার ব্যবহার ভদ্রতা মেধামননশীল এই তরুন যুবক ১৯৯২ সালে বিএ পাশ করেন। মেধা যোগ্যতা বলে স্থানীয় পিআর সি ইনস্টিটিউশন এর ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে চাকরি করছেন।
মামুন স্যারের পাঠদানে উপকৃত কেউ শিক্ষক,কেউ সাংবাদিক,কেউ জনপ্রতিনিধি আবার কেউবা পুলিশ হয়ে দেশের নানা প্রান্তে চাকরি করছেন।
স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক মামুর স্যার পাঠদানের বাহিরেও ছিলেন ব্যতিক্রম। বিকেলের খেলার মাঠে শিক্ষার্থীদের সাথে তিনিও হয়ে যেতেন একজন জনপ্রিয় খেলোয়ার। অত্যন্ত হাস্যজ্জল বন্ধুসূলভ আচরণে বিনোদনে প্রান ফিরে পেতো সিনিয়র জুনিয়র সহযোদ্ধারা। ফুটবল,কাবাডি,ভরিবল ও রাতের আঁধারের কৃত্তিম আলোয় র্যাকেট সহ বিভিন্ন খেলার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে তিনিও ছিলেন অন্যতম।
বিকেলের খেলার মাঠের বন্ধু মামুন স্যার সন্ধায় পড়া ফাঁকি দিয়ে হাট বাজারে আড্ডা দেওয়া ছাত্রদের মাঝে ছিলেন আতংকের নাম। অসময়ে আড্ডাবাজি দেখলে ই ছাত্রদের তাড়িয়ে দিতেন। কাছে পেলে শাস্তি দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। ফলে আড্ডার বদলে ছাত্ররা পড়ার টেবিলকেই প্রকৃত আড্ডাস্থল মনে করে পড়াশুনায় আগ্রহী হতে।
মামুন স্যারের এমন শাসনকে সচেতন অভিভাবকরাও মনেপ্রাণে স্বাদুবাদ জানাতো। স্কুল কলেজে পড়ুয়া এরকম হাজারও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাঠদানে একমাত্র সহয়তাকারি মামুন স্যার দক্ষতা আর পরিশ্রম দিয়ে শিক্ষায় সহযোগীতা করে চলেছেন।
তার এই সহযোগীতা অব্যহত রয়েছে প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে। তার মেধা বিচক্ষনতায় পিআরসি ইনষ্টিটিউশন যেমন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গোটা বরিশালে আলোকিত,তেমনই স্থানীয় এক একটি পরিবার সমাজের একজন আদর্শ শিক্ষক হতে যে সব গুনের প্রয়োজন সব ই যেনো মামুন স্যারের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।
স্কুলের যেকোন পরীক্ষার সময় তিনি অলস সময়টি শিক্ষার্থীদের কাজে ব্যয় করতেন। ছুটে যেতেন প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি । এতে ছাত্র শিক্ষক অভিভাবকদের সাথেও তৈরি হত সেতুবন্ধন। শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অবদান মামুন স্যারের।
শিক্ষা ছাড়াও মামুন স্যার স্থানিয় মসজিদ,মাদ্রাসা ,প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ একাধিক সমাজসেবামুলক সংস্থায় সুনামের সাথে যুক্ত আছেন।
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক বরিশাল ২৪.কম-এর সাথে আলাপ করলে খ্যাতিমান এই শিক্ষক জানান, জীবনের একটি বড় অধ্যায় পার করেছি শিক্ষকতা পেশায়। সমাজের ধনী গরিব কাউকে আলাদা করে দেখিনি।
যার যখন প্রয়োজন হয়েছে চেষ্টা করেছি সাধ্যমত সহযোগীতা করতে। তিনি তার প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবার কথা স্মরণ করে বলেন, আমি আমার বাবাকে দেখেছি মানষের উপকার করতে। বাবার দেখানো সে পথেই আমাকে আজকের মামুন স্যার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে মানুষ।
শিশুদের সাথে ভালো ব্যবহার ও তাদের মন বুঝে চলতে অভিভাবকদের পরামর্শ দেন সবার কাছে শ্রদ্ধাভাজন আবু আহমেদ আল মামুন ।
লেখক: মনিরুজ্জামান (সোহেল আহমেদ), সাংবাদিক, দৈনিক বরিশাল ২৪.কম।
বার্তা সম্পাদনায়: শহিদুল ইসলাম শুভ।