অনলাইন নিউজঃ ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি আমি টিচার হবো। আব্বা -আম্মা তেমনটাই বলতো সবসময়। আমিও তেমনটাই ভাবতাম। স্কুল কলজের গণ্ডী পেরিয়ে ভাল ছাত্রীর তকমা সেঁটে গেলো কপালে।
বড় ভাইয়ের বুয়েটের এডমিশন টেষ্ট…. সাদা খাতা জমা দিয়ে এলো। কারণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যম্পাসের প্রেমে পড়েছে। সে অর্থনীতিতে ভর্তি হলো।
কড়া শাসনের বেড়াজালে আমরা ছিলাম। মেডিকেল এডমিশন টেষ্ট দেবার ফর্ম আনতে বন্ধুরা রাজশাহী যাচ্ছে৷ আমি কোনোদিন রাজশাহী দেখিনি। সাহস করে বাসায় বললাম। ভাইয়ার ওকালতিতে অনুমতি মিললো। বেড়াতে যাবার আনন্দে আত্মহারা আমি। মেডিকেলের হোষ্টেলে উঠলাম। রেহানা আপা, পপি আপা, ছায়া আপা….উনাদের সাথে থাকলাম। ভাইয়া আমাকে ওর হোষ্টেলে নিয়ে গেলো৷ ক্যাম্পাসে ঘুরলাম। কি সুন্দর, কি সুন্দর!
পাবনায় এসে ভুলেই গেলাম পরীক্ষার কথা। লিখিত পরীক্ষার ডাক এলো। কি মনে করে আব্বা- আম্মা অনুমতি দিলো। এরপর ভাইভা… সর্বোচ্চ নম্বর পেলাম।
পাবনায় আসার পর বড় চাচা আব্বাকে একটা চিঠি লিখলেন। বড়চাচা মো নুরুল ইসলাম তখন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ। মোদ্দা কথা ছিল, আমি যেনো মেডিকেলে পড়ি।
আব্বার মন মনে হয় একটু নরম হলো। ডেকে বল্লো… ঢাকা মেডিকেলে হলেই কেবলমাত্র ভর্তি করবে। আমি তো কোনো প্রিপারেশন ছাড়াই পরীক্ষা দিয়েছি। আমার চান্স পাওয়া হবে না এটা নিশ্চিত। সুবোধ বালিকার মত ঢাকা ইউনিভার্সিটির জন্য পড়তে শুরু করলাম।
পেপারে রেজাল্ট দিলো। আব্বা, ভাইয়া, শোভন নীচ থেকে দেখছে৷ আমি নিঃশ্বাস আটকে বসে আছি। রাজশাহী,রংপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল… কোথাও নাম নেই। হয়নি তোর… আব্বা মনটা খারাপ করেই বললো। আব্বার একটা বিশ্বাস ছিল আমি চান্স পাবো। সবশেষে ঢাকা মেডিকেল দেখছে ওরা…. আছে আমার রোল আছে! আমি খুশীতে বাগবাগ।
ভর্তি হলাম। ক্লাশ শুরু হলো৷ কিন্তু আমি তো ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিচার হবো। এপলাইড কেমিস্ট্রিতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হলাম। এবার ভর্তির পালা। আব্বার কাছে বললাম। দু’দিন পর আব্বা ফোন করে বললো দুই নৌকায় পা দেওয়ার দরকার নাই। মেডিকেলেই পড়ো।
ছোটভাই রাজশাহী মেডিকেল এবং পরে মাইগ্রেশানে সলিমুল্লাহ মেডিকেলে…. ভাগ্য ভাল ওকে ডাক্তার হতে হয়নি। আম্মা আর আমি ওকে নিরুৎসাহিত করি বারবার। শোভন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়।শোভন ডাক্তার হয়নি এটা আমাকে পরম শান্তি দেয়। এই জীবনটা যুদ্ধের আর……… থ্যাকংস লেস জবে শোভনকে দেখতে আমার মোটেই ভাল লাগতো না।
আমার রিজিক লেখা ছিল এইভাবে। পরবর্তী সময়ে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিতে ঘিরে ধরেছে ভাল লাগা। আমি আমার এই পেশাকে অত্যন্ত পছন্দ করি।রোগ আর রোগী নিয়ে কাজ আমার..… আমি আনন্দের সাথে কাজ করি। একজন রোগী যখন সুস্থ হয়ে যায়, তার কষ্ট কমে যায়…. নিজেকে ধন্য মনে হয়। কত রোগী মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে যায়। কত রোগী আদর করে যায়। আমি নিষেধ করি না…. এটা তাঁদের কাছে একটা আনন্দের প্রকাশ, কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
আমি জানি অনেক সীমাবদ্ধতা আছে আমার, অনেক প্রতিবন্ধকতাও আছে। তবুও দিনশেষে আমার রোগীরাই আমার শক্তি। তাঁদের সুস্থতাই আমার জন্য দোয়া। কোনো ডাক্তার চায় না তাঁর রোগী সুস্থ না হয়ে বাড়ী যাক। একেকজন রোগী একেকটা বই…. আমি পাঠ করি মনোযোগ দিয়ে।
আমি পড়াতে খুব পছন্দ করি। অনেক ছাত্র ছাত্রী আমার। ওরা যে সম্মান আমাকে দেয়…. আমার বুকটা ভরে থাকে। আমি এখন টিচার। আব্বা আম্মা যেমনটি চেয়েছিল… আমি এখন সেখানেও পৌঁছে গেছি আল্লাহর রহমতে। ক্লাশ নিতে আমার কোনো ক্লান্তি নেই। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সবখানে ক্লাশ নেই যার সাথে পারিশ্রমিকের কোনো সম্পর্ক নেই। বিদ্যা আর জ্ঞান বিলিয়ে দেবার বিষয়, কুক্ষিগত জ্ঞান তো জ্ঞান নয়। আমার অবর্তমানে আমার ছাত্র ছাত্রী…. ওদের কাজের মাঝে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রত্যাশা এটুকুই। আর রোগীরা সঠিকভাবে ট্রান্সফিউশন পাবে, হেসে উঠবে জীবন।
আমার এই রিজিক নির্ধারিত আল্লাহর তরফ থেকে। আমার ডাক্তার হওয়াও নির্ধারিত আল্লাহর রহমতে। রিজিক যতদিন আছে… আমি ভয় পাই না। নিশ্চয়ই রিজিকের মালিক আল্লাহ।
জি আমি ডাক্তার…. আপনার/ আপনাদের অসুখে আমার সাধ্যমত আমি কাজ করি। তবে ডাক্তার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। আমরা নিমিত্ত মাত্র।
নিজের এই পরিচয়ে আমি পরিতৃপ্ত।
ফারহানা নীলা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা।
(লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া)
পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম