অনলাইন নিউজঃ রাত ৩টা, কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা এলাকা। শিপন সেনের স্ত্রী প্রান্তি সেন প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছিলেন। কোথাও গাড়ি নেই, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও পাচ্ছিলেন না। নিরুপায় হয়ে থানার সহায়তার চান শিপন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি নিয়ে শিপনের বাসার সামনে হাজির পুলিশ।
পুলিশ সদস্যরা প্রান্তি সেনকে নিয়ে যান আন্দরকিল্লা জেমিসন রেডক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতালে। রাত জেগে ওষুধ আনা থেকে শুরু করে সব জরুরি কাজই করেন পুলিশ সদস্যরা। শিপন ফুটফুটে এক মেয়ের বাবা হন।
শিপন ও তার স্ত্রীর তখন দু’চোখে পানি। এ কান্না খুশির, আনন্দের। আর পুরো বিষয়টি মনিটরিং করেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহসীন। ঘটনাটি ৭ এপ্রিলের।
গত এক মাসে এমন অসংখ্য কেস স্ট্যাডি পাওয়া যাবে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার। থানার ওসি মহসীনসহ পুরো স্টাফ মিলে যা করছেন তা সত্যিই ব্যতিক্রম। নজির এসব কার্যক্রমের সাক্ষী চট্টগ্রামবাসী।
এখন আরো দু’একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
২ এপ্রিল রাত ১০টায় থানায় ফোন করে খাবারের সহায়তা চান এক দরিদ্র পরিবার। তৎক্ষণাৎ ওসির নির্দেশে পাঠানো হয় চাল, ডাল, আলু, তেল, লবণ ও সাবানসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ। এরকম শত শত পরিবারকে দিন-রাত পরিচয় গোপন করে খাবার সহায়তা অব্যাহত রেখেছে কোতোয়ালি পুলিশ।
ডোর টু ডোর শপ
করোনা ভাইরাসের লকডাউনের মধ্যে যখন বাসায় বন্দি মানুষ তখন ব্যতিক্রম এক উদ্যোগ নেয় কোতোয়ালি থানা পুলিশ। ‘দোকানই যাবে আপনার ঘরে’ এ স্লোগান সামনে রেখে ডোর টু ডোর শপের ব্যবস্থা করা হয়। কল করে যে কেউ যোগাযোগ করলেই স্ব স্ব ঠিকানায় পুলিশের গাড়ি নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী নিয়ে হাজির। এ সার্ভিসটি এখনও অব্যাবহত রয়েছে।
এছাড়া অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের তালিকা করে বাসায় বাসায় ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। সড়কে ভ্রাম্যমাণ মানুষ, রিকশা চালকদেরও প্রতিদিনই খাবারসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে থানার উদ্যোগে।
স্যার ঘরে ভালো লাগে না
‘স্যার ঘরে ভালো লাগে না’ ডায়ালগটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয় ১১ এপ্রিল (রোববার)। সড়কে জনাসমাগম এড়াতে কোতোয়ালি থানা পুলিশের অভিযানের মধ্যে ঘটনাটি। নিউমার্কেট এলাকায় একদল কিশোরকে বাসায় না থেকে বাইরে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চান ওসি মো. মহসীন। এসময় ওই কিশোরদের উত্তর- ‘স্যার বাসায় ভালো লাগে না। বাইরে বের হয়েছি বাতাস খেতে।’
পরে মো. মহসীন তাদের থানায় নিয়ে গিয়ে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বোঝান, আর বাসার বাইরে না যেতে অনুরোধ করেন এবং তাদের প্রয়োজন মেটাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিদিনই এ অভিযান অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
এছাড়া মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এ পর্যন্ত কোতোয়ালি এলাকায় ১০ হাজার মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করার পাশাপাশি মাইক নিয়ে করোনা সম্পর্কে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি।
কোয়ারান্টিনে থাকাদের উপহার, থ্যাংকস লেটার
বিদেশ থেকে আসা কয়েকশ মানুষকে হোম কোয়ারান্টিন নিশ্চিত করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। হোম কোয়ারান্টিনে থাকাদের বাসায় বিভিন্ন সময় ফল-ফ্রুট সার্ভিস ও উপহার এবং কোয়ারান্টিন সম্পন্ন করাদের থ্যাংকস লেটার দেন ওসি মো. মহসীন।
গান গেয়েও করোনা সচেতনতা
তারা কোনো গায়ক নন, গীতিকার কিংবা সুরকারও নন। তবুও তারা গান লিখেছেন, সেই গানে সুরও দিয়েছেন। করোনা ভাইরাসে জনগণকে সচেতন করতে গান নিয়েও হাজির হয় টিম কোতোয়ালি। গানটিও ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
দলবেঁধে গাওয়া গানটির উদ্যোক্তা হলেন ওসি মো. মহসীন। গানটির লেখা ও সুর করা উপ-পরিদর্শক মনজুরুল আলম ভূঁইয়ার। সহযোগী শিল্পী ছিলেন উপ-পরিদর্শক বাবুল কুমার পাল, তোফাজ্জল হোসাইন, নেলী দাশ ও মিজানুর রহমান চৌধুরী।
গানটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি করোনা সচেতনতার বিভিন্ন দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়।
গানটির গীতিকার ও সুরকার পুলিশের উপ-পরিদর্শক মনজুরুল আলম ভূঁইয়া বাংলানিউজকে বলেন, স্কুলে পড়ার সময় কিছুটা গান চর্চা করেছিলাম। তখন মায়ের লেখা একটি জারি গান স্কুলে গেয়েছিলাম। মূলত ওই গানটির আলোকে করোনা সচেতনতামূলক গানটি গাওয়া।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহসীন বাংলানিউজকে বলেন, আমরা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের শুরু থেকে জনগণের সেবায় ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত। জরুরি খাবার পৌঁছে দেওয়া, বিদেশফেরতদের বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টিনে রাখার কার্যকরী ব্যবস্থাসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। এখনও তা অব্যাহত আছে।
তিনি বলেন, জনসমাগম করে করোনা সচেতন করতে পারছি না। তাই গানের মাধ্যমে সচেতন করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া। গানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নানা নির্দেশনা যেমন আছে, তেমনি করোনা প্রতিরোধে নানান সচেতনমূলক কথাও রয়েছে।
তিনি জানান, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার মজুদদারের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই অভিযান, কোতোয়ালি এলাকায় হাত ধোয়ার জন্য ভ্রাম্যমাণ বেসিন, ভ্রাম্যমাণ অসহায়দের তৈরি করা খাবার বিতরণ, ডোর টু ডোর হোম সার্ভিস, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়ে টেলিমেডিসিন সেবা, অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা, জলকামান দিয়ে স্প্রে ছিটানো, স্টে হোম নিশ্চিতে পাঁচটি মোবাইল টিম, মসজিদে মসজিদে করোনা সচেতনতায় নানা বাণী প্রচার করা হচ্ছেও বলে জানান ওসি মো. মহসিন।