ইসলামী অর্থনীতিতে চাষাবাদের ভূমিকা
কোরআন শুধু কৃষির কথা বলেনি; বরং কৃষিকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক। আমিই প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করি। তারপর আমি ভূমিকে বিদীর্ণ করি। অতঃপর আমি তাতে উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর, শাকসবজি, জলপাই, খেজুর, ঘন বৃক্ষবিশিষ্ট উদ্যান, বিভিন্ন ফল এবং তোমাদের ও তোমাদের গবাদিপশুর জন্য খাদ্য।’ (সুরা : আবাসা, আয়াত : ২৪–৩২)
এই আয়াতগুলো ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনেরও ভিত্তি। কারণ মানুষের খাদ্য, পশুর খাদ্য এবং সমাজের জীবনধারণের প্রধান উপকরণ কৃষির মাধ্যমেই আসে। তাই কৃষি কেবল একটি পেশা নয়; এটি মানবসভ্যতার স্থায়িত্বের অন্যতম স্তম্ভ। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য তা (বৃষ্টি) দ্বারা উৎপন্ন করেন শস্য, জলপাই, খেজুরগাছ, আঙুর এবং সব ধরনের ফল। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১১)
বৃষ্টি, মাটি ও বীজের সমন্বয়ে ফসলের উৎপাদন মানুষের কাছে একটি স্বাভাবিক ঘটনা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি মহান আল্লাহর অসীম রহমতের প্রকাশ। তাই কৃষি মানুষকে কৃতজ্ঞতা, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ মৃত জমিনকে জীবন্ত করে তোলার দৃশ্যের মাধ্যমে পুনরুত্থানের বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘তুমি ভূমিকে শুষ্ক দেখবে। অতঃপর আমি যখন তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদ্গত করে সব ধরনের নয়নাভিরাম উদ্ভিদ।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৫)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করি। অতঃপর তা দিয়ে বাগান, পরিপক্ব শস্যরাজি এবং সুউচ্চ খেজুরগাছ উৎপন্ন করি—যার মধ্যে রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ ফল। এগুলো আমার বান্দাদের জীবিকার জন্য। আর এ পানি দ্বারা আমি মৃত ভূমিকে জীবিত করি। এভাবেই পুনরুত্থান ঘটবে।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ৯–১১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কৃষিকাজকে সদকায়ে জারিয়ার মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে অথবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি কিংবা কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩২০)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারো হাতে একটি চারা থাকে এবং তা রোপণের সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ১২৯০২)
এই হাদিস ইসলামের উৎপাদনমুখী মানসিকতা, আশাবাদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের অনন্য শিক্ষা বহন করে। পৃথিবীর শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও উৎপাদন ও কল্যাণমূলক কাজ অব্যাহত রাখার নির্দেশ ইসলামের অর্থনৈতিক চিন্তার গভীরতা প্রকাশ করে।
ইসলামী অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব বহুমাত্রিক। কৃষি মানুষের জন্য হালাল জীবিকার উৎস, জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি, খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি, কর্মসংস্থানের অন্যতম ক্ষেত্র এবং দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর মাধ্যম। একই সঙ্গে কৃষির মাধ্যমে জাকাত, সদকা ও সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়। কৃষিভিত্তিক উৎপাদন বাড়লে সমাজে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকে, খাদ্যসংকট কমে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হয়।
ইসলাম অপচয়, জমি অনাবাদি রাখা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অবহেলাকে নিরুৎসাহিত করেছে। বরং জমিকে আবাদ করা, বৃক্ষরোপণ, পানির সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকে উৎসাহিত করেছে। ফলে ইসলামী অর্থনীতিতে কৃষি শুধু উৎপাদনের মাধ্যম নয়; বরং এটি নৈতিকতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার এক সমন্বিত ব্যবস্থা।












