তামিম ইকবালের হার্ট অ্যাটাক প্রসঙ্গে ডা. দেবব্রত হালদারের সচেতন বার্তা
ডা.দেবব্রত হালদারঃ
তামিম ইকবাল বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম সারির ও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট টিমের অন্যতম একজন প্লেয়ার ছিলেন। তার এই ভালো মানের প্লেয়ার হতে তাকে অনেক বছর ধরে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিয়মিত শারিরীক ব্যায়াম করতে হয়েছে বা এখনো করছিলেন। এটা তিনি করেছেন ছোট বেলা থেকেই এবং নিয়মিত। তার বয়সও তেমন বেশি নয়, তিনি এখনো খেলার মধ্যেই ছিলেন, খেলা থেকে এখনো তেমন ভাবে অবসর নেন নি। এমন শারীরিক ফিটনেস ধরে রাখার পরও তার হার্টের রক্তনালিতে ১০০% ব্লক ধরা পরেছে। এটা কিন্তু আমাদের চিকিৎসকদের কাছে একটা বড় চিন্তার বিষয়।
✅ আমরা রোগীদের সব সময় উপদেশ দিয়ে থাকি হার্ট ভালো রাখতে হলে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করতে।
তবে হ্যাঁ, তামিম ইকবালের এই ব্লকটা কিন্তু এক দিনেই হয়নি, ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে এটা ১০০ ভাগ ব্লকে পরিনত হয়েছে। যতটুকু খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি উনার উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ছিল না, উনি অধুমপায়ী ছিলেন । এখন কথা হলো, তাহলে তামিম ইকবালের মত একজন শারিরীক ভাবে শতভাগ ফিট প্লেয়ারের কিভাবে এমন ব্লক তৈরি হলো? এর অবশ্য অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে আমার ধারণা এই ব্লকের কারণ তার খাদ্যাভ্যাস। উনাদের মত উচ্চমানের, দেশের জাতীয় টিমের প্লেয়াররা সাধারণত বড় বড় হোটেল রেস্টুরেন্টের খাবার নিয়মিত খেয়ে থাকেন। এসব হোটেলের খাবার মুখরোচক কিন্তু শরীরের জন্য বিষাক্ত। এসব খাবারে বিভিন্ন ধরনের মসলা, সুগন্ধি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ঘি, তেল, ডালডা, ফুড কালার ইত্যাদি প্রচুর ব্যবহার করা হয়। এসব খাবারে প্রচুর পরিমানে প্রোসেজড ফুড বা উচ্চ প্রক্রিয়াজাত খাবার থাকে যাতে অস্বাস্থ্যকর চর্বি, শর্করা, প্রোটিন, এচিনি সংযোজন করা থাকে। উচ্চমানের হোটেল রেস্টুরেন্টে ডেজার্ট, ফাস্টফুড ইত্যাদির একটা বড় আইটেম থাকে যে সব আইটেমে অতিরিক্ত চিনি, ফুডকালার, প্রসেজড ডেয়ারি ফুড, আরটিফিয়াল সুগন্ধি ইত্যাদি খুব বেশি থাকে। পাউরুটি, কেক, পেস্ট্রি, পুডিং, আইসক্রিম, এধরনের প্রতিটি খাবারই চিনিযুক্ত, প্রসেজড ডেয়ারি, ফুড কালার সমৃদ্ধ।। আর চিনি ও অন্যান্য উপকরণ রক্তনালিতে কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়, হার্টের রক্তনালিতে কোলেস্টেরল জমা হয়ে হার্ট এটাকের ঝুঁকি বাড়ায়, এমনকি মানুষটি দেখতে মোটাসোটা না হলেও। দামি হোটেলে রেডিমিট, চিংড়ি, বড় মাছ, উচ্চ চর্বি ও প্রোটিন যুক্ত খাবারের মুখরোচক দামি মেনু থাকে। এসব খাবার মুখরোচক কিন্তু শরীরের জন্য খুবই মারাত্মক ক্ষতিকর । এসব খাবার গুলোর উপকরণ দেহের রক্তনালিতে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং হার্টের রক্তনালি ব্লক করে দেয় অতি সহজেই। কোমল পানিয়, বিভিন্ন ধরনের ফ্রুটস জুস যাতে মেশানো থাকে অতিরিক্ত চিনি, ফুড কালার, আর্টিফিশিয়াল সুগন্ধি। এগুলো হার্টের ব্লক তৈরির প্রধান উপকরণ। দামি হোটেলে ঘি-মাখন-ডালডার ব্যবহার খুবই বেশি। এগুলো উচ্চমাত্রার সাচুরেটেড ফ্যাট। আর এগুলো দেহের তথা হার্টের রক্তনালির ব্লক তৈরির প্রধান কারন।
✅ তামিম ইকবালের মত প্লেয়াররা জীবনের বেশির ভাগ সময়ই উচ্চমানের দামী হোটেল রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়েছেন। এটা তাদের প্রফেশনের কারনে খেতে হয়েছে। আর এই খাদ্যাভ্যাসই তামিম ইকবালের হার্টে ব্লকের কারণ সম্পর্কে ধরনা করা যায়। শুনেছি যে, বিদেশের অনেক বড় বড় প্লেয়াররা ভেজ বা নিরামিষ খাবার খেয়ে থাকেন।
✅ পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমানে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত সবাই এধরণের প্রসেজড, আর্টিফিসিয়াল উপকরণে তৈরি খাবারে মত্তে রয়েছেন। ঘরে খাবার নিজেরা তৈরি না করে বাহিরের হোটেল রেস্টুরেন্টের খাবারের প্রতি মোটামুটি একটা শ্রেনির লোকজন খুব বেশি ঝুঁকে পরেছেন, বিশেষ করে উচ্চবিত্তের মানুষ। ইদানীং আমরা অনেক ইয়ং রোগী পাচ্ছি, যাদের উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস নেই, যারা হার্ট অ্যাটাক নিয়ে আমাদের চেম্বার ও হাসপাতালে আসছেন। এর মূল্য কারন খাদ্যাভাস, অপর্যাপ্ত ঘুম, শারিরীক পরিশ্রম বিহীন জীবন যাপন, অতিরিক্ত মোবাইলে আসক্ত।
✅ শেষ কথা: হার্টকে সুস্থ রাখতে :
১। নিয়মিত শারিরীক পরিশ্রম/ব্যায়াম।
২। ওজন নিয়ন্ত্রণ।
৩। ফাস্ট ফুড, প্রসেজড ফুড, কোমল পানিয় বর্জন।
৩। রেডমিট বা লালমাংস পরিহার।
৫। নিয়মিত শাকসবজী ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ।
৬। ধুমপান, মাদক বর্জন।
৭। উচ্চরক্তচাপ, ডায়াডেটিস সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৮। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
লেখকঃ ডা. দেবব্রত হালদার, সিনিয়র কনসালটেন্ট, কার্ডিওলজিষ্ট, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল।












