ফ্রেমের বাইরে চলে গেল দুই মুখ
মোঃ রফিকুল ইসলামঃ
ক্যামেরার পেছনের মানুষরা সাধারণত ছবিতে থাকেন না। তাদের মুখ খুব বেশি মানুষ মনে রাখে না। অথচ তারাই হাসি, কান্না, ভাঙন, স্বপ্ন সবচেয়ে বেশি মানুষকে দেখান।
আসাদ চৌধুরী ঠিক তেমনই একজন ছিলেন। অন্যের জীবনের মুহূর্তগুলো ধরে রাখতে রাখতে নিজের জীবনটাও যে একদিন ফ্রেমের বাইরে চলে যাবে এ কথা কেউ ভাবেনি।
সোমবার সন্ধ্যায় শহর তার নিজের ছন্দেই চলছিল। কোথাও আলো জ্বলছিল, কোথাও আড্ডা বসছিল। সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেই নিঃশব্দে থেমে গেল আসাদের জীবন।
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ফুসফুসের সংক্রমণের সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই আর এগোয়নি। সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে সবকিছু থেমে যায়।
ক্যামেরা পার্সন আসাদের জীবন এমনই, সবসময় অন্যের গল্প তিনি তুলে ধরতেন। সামনে থাকে ঘটনা, পেছনে থাকতেন আসাদ।
কিন্তু সেই পেছনের মানুষটি হঠাৎ সামনে চলে এলে, তখন তাকে নিয়ে ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। আসাদের বয়স বড়ো জোড় আড়াই কুড়ি আশপাশে। এই অসমেয় চলে যাওয়া আমাদেরকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
এর আগের সকালটাও সংবাদকর্মীদের জন্য ভারী ছিল। রবিবার দিনের শুরুতেই আসে আরেকটি খবর। বরিশাল থেকে প্রকাশিত দৈনিক দক্ষিণবঙ্গ পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক সাইদুর রহমান সাঈদ চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
খুব অল্প কথার মানুষ ছিলেন, কিন্তু তার উপস্থিতি ছিল ভরাট। সহকর্মীদের কাছে তিনি শুধু সহকর্মী নন, ছিলেন আড্ডার সঙ্গী, মাঠের ভরসা।
এক দিনের ব্যবধানে দুই তরুণ সংবাদকর্মীর বিদায় আমাদের এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা তৈরি করেছে। সবকিছু আগের মতোই আছে, কিন্তু কোথাও যেন একটা তাল কেটে গেছে।
সংবাদকর্মীদের অফিসে এখনো কিবোর্ডে শব্দ হচ্ছে, ক্যামেরা এখনো চালু আছে। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, কিছু একটা কম আছে।
আসাদ হয়তো এই দৃশ্যটা অন্যভাবে ধরত। সাঈদ হয়তো এই লাইনটা একটু অন্যভাবে লিখত। এমন ভাবনা জড়ো হয়েছে সংবাদকর্মীদের মাঝে।
এই পেশায় মৃত্যু নতুন কিছু নয়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ হারিয়ে যান, আর সেই খবরই আমরা লিখে দিই।
কিন্তু নিজের খুব কাছের মানুষদের চলে যাওয়া, এটা কখনোই ‘রুটিন নিউজ’ হয়ে ওঠে না।
আসাদ রেখে গেছেন অসংখ্য দৃশ্য, যেগুলোতে তিনি নেই, কিন্তু তার চোঁখ আছে। সাঈদ রেখে গেছেন শব্দ, যেগুলোতে তার কণ্ঠ নেই, কিন্তু তার ভাবনা আছে।
আমি যখন চলো যাবো হয়তো কারো কারো অবচেতন মনে মাঝে মধ্যেই উকি দিবো। আমার লেখা প্রতিবেদনগুলো সহকর্মীরা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করবেন। তখন আমিও ফ্রেমের বাইরে চলে যাবো।
মানুষ শেষ পর্যন্ত এভাবেই থেকে যায়, নিজের কাজের ভেতর, অন্যের স্মৃতির ভেতর।
আর হঠাৎ কোনো এক সন্ধ্যায়, কাজের ফাঁকে মনে পড়ে,
ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আসাদ, অথবা পাশে বসে লেখা সাঈদ আমাদের মাঝে আর নেই।












