সংস্কারের অভাবে হাড়িয়ে যাচ্ছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি
সোহেল আহমেদ: সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সুনজড় আর সংস্কারের অভাবে বিলিন হয়ে যাচ্ছে বরিশালের লাখুটিয়া জমিদারবাড়ি। হাড়িয়ে যাচ্ছে শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য। অথছ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিলো এটি ।
মুক্তিযুদ্ধ কালে প্রথমে সেনাবাহিনী ৯ নং সেক্টরের বরিশালের বীর মুক্তিযোদ্ধা জল কাদের মোল্লা,বাবুগঞ্জের আবদুল ওহাব খান,আব্দুল খালেক পোন্চায়েত , আব্দুল মজিদ খানদের প্রথমে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
তারা স্থানীয় তরুন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। তাই জমিদার বাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম রাজ স্বাক্ষী একটি স্থাপনা। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার বঞ্চিত হয় বাড়িটি। ফলে ক্ষত বিক্ষত জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য নস্ট হচ্ছে।
তরুন প্রজন্মের নিকট অজানাই থেকে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ কালের ইতিহাস। বর্তমান সরকারের বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের মাননীয় যুগ্ন-সচিব মো: সফিকুজ্জামান মনে করেন,বরিশালের জেলা প্রশাসন এগিয়ে এলেই বাড়িটির সংস্কার কাজ সম্ভব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বরিশাল নগরীর বিমান বন্দর থানার ২ নং কাশিপুর ইউনিয়নের লাখুটিয়া গ্রামে ( বাবুরবাড়ি) অবস্থিত বাড়িটির আয়তন প্রায় ৫০ একর। প্রাচীন জমিদারী প্রথা ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত চার রাজা বাস করে তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
রাজা রায়েত চন্দ্র রায়,সুরেন বাবু,ঘুগু বাবু ও রাখাল বাবু সবাই পরোলক গমন করলেও বেঁচে আছেন উত্তরসূরীরা। জমিদার কন্যা মন্দিরা দেবী বরিশালের মুখার্জি বাড়িতে বসবাস করছেন। অন্যরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন।
বাড়ির প্রবেশ মুখেই রয়েছে বিশাল আকৃতির পদ্ম পুকুর। এটি পদ্ম দিঘী নামে বেশি পরিচিত। একটি উচ্চতা সম্পন্ন প্রাচীন মন্দিরসহ মোট ছয়টি পুরনো উঁচু মঠ রয়েছে । সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্যময় বিশাল এলাকা জুড়েই পথে পথে জমিদারি নিদর্শন।
সারসী দিঘী,শিববাড়ি দিঘীসহ মোট চারটি দিঘী রয়েছে। এই দিঘীতেই শিতের সময়ে অতিথি পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতি র পশুপাখির বিচরণ দেখা যায়। কৃষিখামারের বর্তমান অফিসসহ মোট ৫ টি পুরোনো ভবনই জমিদারি আমলের।
এগুলোকে সংস্কার করে এখনও ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হয়েছে। বাদ পড়েছে শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রানের সেই মুল ভবনটি। বাড়ির দক্ষিন পশ্চিম প্রান্তে বিশাল একটি সারসী দিঘী।
জমিদার বাড়ির নিচতলায় একটি সুরঙ্গ পথ রয়েছে। জমিদাররা কয়েকটা সুরঙ্গ খুড়ে বানর পালতেন। সাথে অন্যান্য বন্যপ্রাণীরও বিচরণ ছিল এখানে।
একসময়ের এসব জমিদাররা এলাকার হতদরিদ্র মানুষের সহয়তা এগিয়ে এসেছেন। স্থানীয় নাম করা পি, আর, সি ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষিত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন। সৃস্টি করেছেন দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান।
জমিদাররা ছিলেন পরোপকারী। যাকে যে ভাবে পেড়েছেন সাহায্য করেছেন। বাড়িটি ঘিরে আছে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এক জলন্ত প্রমান। মুক্তিযুদ্ধ কাল সময়ে ৯ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল এই বাড়ি।
প্রথমে তৎকালীন সেনাবাহিনী শত্রুদের মোকাবেলা করতে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওহাব খান,জল কাদের মোল্লা,আব্দুল মজিদ খানদের প্রশিক্ষণ দেয়। এর মধ্যে মেজর জলিল ছিলেন প্রধান। তার অধিনস্ত মেজর মন্জুরুল ইসলাম এই প্রশিক্ষণ পরিচারণা করেন।
সেনাবাহিনী কতৃক প্রথমে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়ে আব্দুল ওহাব খান,জলকাদের মোল্লা ও আব্দুল মজিদ খান বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে স্থানীয় মুক্তি কামী বীর সেনাদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন।
একটা সময় জমিদার বাড়িটি হয়ে ওঠে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা দেয়া বীর সেনাদের প্রানকেন্দ্র।
এখান থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব ( মাস্টার) , ডা: হারুন অর রশিদ,আব্দুল বারেক পঞ্চায়েত ,সৈয়দ আবু তাহের,আবুল কাশেম (মানিক), রহমত আলী,সেকান্দার মাস্টারসহ শত শত সৈনিক। মুক্তিকামী মানুষের খোঁজ খবর নিতে তখন বর্তমান সরকারের শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুও এই বাড়িতে এসেছিলেন।
বাড়ির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। চারপাশের দরজা,জানালা,লোহার ভীম বেশ পুরনো হয়ে গেছে। ভেঙ্গে গেছে সিঁড়ি। যে বাড়িতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নানা ইতিহাস। অবহেলা, অযত্নে সেই বাড়িটিই অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সন্তান আবু আহমেদ আল মামুন (মামুন মাস্টার) বলেন বাড়িটি সংস্কার করা না গেলে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে না এর প্রকৃত ইতিহাস। তারা কেবল পাঠ্য বইয়ের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে। মুক্তিযোদ্ধা হারুন ডাক্তারের সন্তান সিএম মনির বলেন,এটা আমাদর প্রানের জায়গা।
হাজারও স্মৃতি রয়েছে এখানে উল্লেখ করে এটি সংস্কারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি দাবি জানান। । এজন্য মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সকলকেই একসাথে কাজ করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাড়িটি সংস্কার প্রশ্নে জানতে চাইলে সরকারের বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের যুগ্ন-সচিব সফিকুজ্জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধেরর ইতিহাস সম্পর্কিত বাড়িটির সংস্কারের জন্য সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত আন্তরিক।
তাই বাড়িটি পরিদর্শন পুর্বক কন্ডিশন বুঝে বরিশালের জেলা প্রশাসনকেই এগিয়ে আসতে হবে। সংস্কার করে বাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের মিউজিয়াম হতে পারে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।
তবে এবিষয়ে জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল গত তিনদিন যাবৎ একাধিকবার ফোন হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে মাননীয় বরিশাল ডিসি স্যারের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে, রাজা রায়েত চন্দ্রের পুত্র দেবেন বাবুর কন্যা মন্দিরা দেবী প্রতিবেদককে জানান,মাটির টানেই আমরা বরিশাল মুখার্জি বাড়িতে বাস করছি। লাখুটিয়ার সকল মানুষই চায় বাড়িটির অন্তত মূল বাড়িটার সংস্কার করে এটি সংরক্ষণ করা হোক।
মন্দিরা দেবী বলেন,বিগত দিনে অনেকবার সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে যোগাযোগের চেস্টা করেছিলাম। সারা দেশে ঘটে যাওয়া সিরিজ বোমা হামলায় ঝালকাঠী আদালতের বিচারক তার মেয়ে জামাই নিহত হন। তারপরই বাড়িটি নিয়ে আগানো সম্বব হয়নি।
উল্লেখ্য, সরকার ১৯ শতকের দিকে জমিদারবাড়িটি নিলামে নিয়ে নেয়। তারপরই গড়ে ওঠে আজকের লাখুটিয়া কৃষি খামার। একযুগ ধরে কৃষি খামারের প্রধান অফিস ছিলো বাড়িটি।
প্রাচীন ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটি দেখার জন্য প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির চারদিক মানুষের বিনোদন কেন্দ্রে পরিনত হয়।












