হেজ ক্যাকটাস ফুলের শোভা
অনলাইন ডেস্ক: ১৭ শ্রাবণ। ধানমন্ডি খেলার মাঠের পাশে ৮ নম্বর রোড ধরে হাঁটছিলাম। রাস্তাটা দিয়ে ধানমন্ডি লেক থেকে ফিরছিলাম। রাস্তার ধারে একটা অশ্বত্থ গাছে ফল ধরেছে। পুষ্ট ফলগুলোর কিছু কিছু পাকতে শুরু করেছে। পাকা ফল খুঁজতে গিয়ে ওপরে তাকাতেই সে গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে একটা বাড়ির ব্যালকনিতে চোখ আটকে গেল। প্রশস্ত ব্যালকনির রেলিং বরাবর সারি করে অনেক ক্যাকটাস গাছ; শাপলার মতো ফুল ফুটে ভরে আছে। কী চমৎকার লাগছে!
হেঁটে হেঁটে বাড়ির গেটে গিয়ে দাঁড়ালাম। নিরাপত্তা প্রহরীর কাছ থেকে জানা গেল, ওটা জব্বার সাহেবের বাসা। খুলনার মানুষ তিনি। খুলনার মানুষ– চট করে খুলনার একটা গ্রামে এই ক্যাকটাস গাছগুলো দেখার স্মৃতি মনে ভেসে উঠল।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ভুলবাড়িয়া গ্রাম পেরিয়ে চাঁদগড় গ্রামের এক গৃহস্থ বাড়িতে এ গাছ দেখেছিলাম। দেয়ালের মতো খাড়া বেড়া তৈরি করে গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে ছিল গাছগুলো। খুঁটির মতো মোটা একেকটা গাছ, শিরাল ও কাঁটাওয়ালা।
বিস্তীর্ণ খাঁ খাঁ করা রতনপুর বিলের মধ্যে এক টুকরো পট্টির মতো সবুজের আঁচল ফেলেছে রাস্তার ধারে কয়েকটি বাড়ি। বাড়িগুলোর চারপাশে বেড়া দেওয়া হয়েছে ফণীমনসা, বাজবরণ আর এই ক্যাকটাস গাছ দিয়ে। স্থানীয় ভাষায় একে বলে সিজগাছ। গাছের যে অঙ্গটাই ভাঙা হোক না কেন, সেখান থেকে দুধের মতো ঘন আঠালো কষ ঝরে। কষটা সুবিধার না, ত্বকে লাগলে জ্বালাপোড়া করে।
দুষ্ট প্রাণী ও লোকদের ঠেকাতে গাঁয়ে এসব গাছের কদর আছে। প্রাকৃতিক জীবন্ত বেড়া, কোনো খরচ নেই, একবার পুঁতে দিলে ত্রিশ-চল্লিশ বছর পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
কার্ল এম শ্যুমান ১৮৯০ সালে হেজ ক্যাকটাসের প্রজাতিগত নাম Cereus hildmannianus রাখেন। পরে ১৯৮২ সালে রবার্তো কিসলিং কৃত Cereus uruguayensis নামটি নাইজেল পি টেলর কিছুটা পরিবর্তন করে এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম C. hildmannianus subsp. uruguayensis রাখেন।
সাধারণত শুষ্ক পাথুরে মাটিতে এ গাছ জন্মে। ফুল রাতে ফোটে ও সকালে মুদে আসে। পূর্ণ প্রস্ফুটিত ফুলের দেখা মেলে রাতে। তখন সাদা দুধেল পাপড়িগুলো শাপলার মতো ছড়িয়ে থাকে। ফুলে নিশাচর পতঙ্গরা আসে। গাছের কাণ্ডগুলো এত ঘনভাবে থাকে যে পাখিরা সহজে সেসব কাণ্ডের ফাঁকে ফাঁকে বাসা তৈরি করে থাকতে পারে। আর ফুল শেষে ফল হলে পাকা ফল সেসব পাখি মজা করে খায়।
বাড়ির সীমানায় গাছগুলো এত লম্বা ও ঝোপাল যে তার কোনো কোনোটির মাথা ঘরের চাল ছাড়িয়ে গেছে। গৃহকর্ত্রী মাহমুদা জানালেন, তাঁর বিয়ে হয়েছে ২৪ বছর। তখন থেকেই এ গাছগুলো একই রকম দেখে আসছেন তিনি। লম্বা হয়, মাথা ঝড়ে ভাঙে, আবার বেড়ে ওঠে। গরমকালে ও বর্ষাকালে গাছে শাপলা ফুলের মতো সাদা ফুল ফোটে। সেই বসন্ত দিনে চাঁদগড় গ্রামে দেখা হেজ ক্যাকটাসে কোনো কুঁড়ি বা ফুল কিছুই ছিল না। সেই ফুলের দেখা পেলাম এ বছর শ্রাবণ দিনে, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার এক ভবনে। তাও একটা-দুটো না, অনেক ফুল! বিস্ময় লাগে, ব্রাজিলের এই গাছ কী করে শত শত বছর আগে বাংলার এমন এক অখ্যাত গাঁয়ে এসে নিবাস গেড়েছিল!
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ












