কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার তাড়া, বরিশাল নৌবন্দরে দাঁড়িয়ে ১৪ লঞ্চ
মোঃ রফিকুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধিঃ বরিশাল নৌবন্দরে শুক্রবার বিকেল নামতেই জমে ওঠে এক অদ্ভুত অপেক্ষা। কীর্তনখোলার জলে ঢেউ আছে, বাতাস আছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি আছে অপেক্ষা। কর্মস্থল ঢাকার পথে যাত্রার সেই প্রতীক্ষা।
ঈদ পরবর্তী ব্যস্ততায় আজ শুক্রবার নৌবন্দরে দাঁড়িয়ে আছে ১৪টি লঞ্চ। একসঙ্গে এত লঞ্চ, অথচ সবাই যেন একই দিকে তাকিয়ে। কখন রাত নামবে, হুইসেল বাজবে, আর শুরু হবে দীর্ঘ জলযাত্রা।
শুক্রবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই লঞ্চঘাটজুড়ে যাত্রীদের ভিড়। কেউ পাটের ব্যাগে গ্রামের উপহার বয়ে আনছেন, কেউ ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে জায়গা খুঁজছেন।
কেউ আবার লঞ্চের ডেকে বেডশিট বিছিয়ে আগেভাগেই জায়গা দখল করে রেখেছেন। তাদের সবার গন্তব্য কর্মস্থল—ঢাকা। কিন্তু যাত্রার গল্প সবার আলাদা।
পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌবন্দর কিছুটা জৌলুশ হারায়। যাত্রীরা ঝুঁকে পড়েন সড়কপথে। তবে ঈদ ঘিরে আবার ফিরেছে সেই চিরচেনা চিত্র। নদীবন্দরে সেই চিরচেনা ভিড়, কোলাহল, আর তাড়াহুড়োর ব্যস্ততা।
পন্টুনে অপেক্ষায় থাকা ১৪টি লঞ্চ শুধু যানবাহন নয়, যেন চলমান লঞ্চের শহর। লঞ্চের প্রতিটি কেবিনে জমে উঠছে গল্প, প্রতিটি ডেকে তৈরি হচ্ছে নতুন পরিচয়। কেউ ফিরছেন কর্মস্থলে, কেউ যাচ্ছেন নতুন জীবিকার খোঁজে।
পন্টুনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে এমভি এম খান ৭, এমভি সুন্দরবন ১৬, এমভি সুরভী ৭, কীর্তনখোলা ১০, এমভি শুভরাজ ৯, এমভি পারাবত ১১ ও প্রিন্স অব আওলাদ।
তবে নৌবন্দরে এত লঞ্চ থাকার পরও সবার নজরের কেন্দ্রে দুই পরিচিত নাম। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতের ট্রিপের চ্যাম্পিয়ন এমভি মানামী এবং রানার্স আপ এমভি কুয়াকাটা ২। যাত্রীদের ভেতর ফিসফাস, আজ কে আগে পৌঁছাবে ঢাকায়?
কিন্তু এই সাজানো সারির বাইরেও আছে আরেক বাস্তবতা। দেরিতে এসে পন্টুনে জায়গা পায়নি পারাবত ১২ ও পারাবত ১৮। তারা সারির একটু দূরে দাঁড়িয়ে, যেন এই ভিড়ের বাইরে থেকেও ভিড়ের অংশ হয়ে আছে।
লঞ্চের সারিতে ঠাঁই হয়নি এমভি সুন্দরবন ১৫ এর। পন্টুনে জায়গা না পেয়ে পেছনে নোঙর করে আছে, চোখে না পড়ার মতো এক কোণে। অপেক্ষায় আছে কখন সামনে আসবে।
অন্যদিকে চাঁদপুরগামী এমভি রেডসান ৫ রাত আটটায় ছাড়ার প্রস্তুতিতে। তার পেছনে অ্যাডভেঞ্চার ৯, জায়গার অভাবে দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা অস্থিরতায়।
পবিত্র ঈদ উপলক্ষে এবার বরিশাল-ঢাকা নৌপথে ২৪ মার্চ থেকে বাড়তি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে একে ‘বিশেষ সার্ভিস’ বলতে চাইছেন না লঞ্চমালিকেরা। যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে লোকসানের কথাও জানাচ্ছেন তারা।
সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুর রহমান পিন্টু বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর যাত্রী কমে গেছে। গত ঈদে বাড়তি লঞ্চ চালিয়েও লোকসান হয়েছে। তাই এবার যাত্রীচাপের ওপর নির্ভর করেই লঞ্চ চালানো হচ্ছে।
আজ শুক্রবার ঢাকা অভিমুখে ১৪টি লঞ্চ ছেড়ে যাবে। ডেকের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১,২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন ২,৪০০ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে এই ভাড়া কিছুটা কম থাকে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, একসময় ঢাকা-বরিশাল নৌপথ ছিল দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত রুটগুলোর একটি।
প্রতিদিন ৬ থেকে ৮টি লঞ্চ চলাচল করত। পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌবন্দর কিছুটা জৌলুশ হারায়। যাত্রীরা ঝুঁকে পড়েন সড়কপথে। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২-এ, কখনো কখনো একটি লঞ্চ চলাচল করে।
তবু আজকের বরিশাল নৌবন্দর যেন অন্য গল্প বলে। এখানে শুধু লঞ্চ নয়, ভিড় করে মানুষ, স্মৃতি, আর ফিরে যাওয়ার তাড়া।
নদী চুপচাপ দেখছে সবকিছু। সময়ও সাক্ষী হয়ে আছে। আর মানুষ বারবার প্রমাণ করছে, ফিরে যাওয়াই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় যাত্রা।












