দক্ষিণাঞ্চলে চলমান উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে ‘পাল্টে যাচ্ছে বরিশালের চিত্র’
জিহাদ রানাঃ বর্তমান সরকারের সময়ে সারাদেশের সাথে বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে বরিশালের-আর্থ সামাজিক উন্নয়নের।
একদিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণাঞ্চলবাসীর বহুল আকাঙ্ক্ষার পদ্মা সেতু, অন্যদিকে পায়রা সমুদ্রবন্দর ও তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে ঢাকা থেকে পায়রা সেতু হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কপথ দৃশ্যমান হবে।
বরিশালের শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন, বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য সেক্টরের উন্নয়নে চলছে সাতটি উন্নয়ন প্রকল্প। আর এসব প্রকল্প পাল্টে দেবে বরিশালের আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে। এমনকি পাল্টে যাবে এ এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকাও।
বরিশাল-খুলনা রুটের মানুষ্বের প্রানের দাবি কঁচা নদীর উপরে বেকুটিয়া সেতুর নির্মান কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। জানা যায়, সেতুটি নদীর তলদেশ থেকে ২৮ দশমিক ৯৮ মিটার উঁচু হবে। ৮২১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে চায়না রেলওয়ে-১৭ ব্যুরো গ্রুপ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান সেতুটি নির্মাণ করছে। মোট বরাদ্দের ৬৫৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা চীন সরকার ও ১৬৭ কোটি ৪ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার।
সামগ্রিকভাবে সেতুটির দৈর্ঘ্য ২.৯৬ কিলোমিটার, যাতে ১.৪৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৩.৪ মিটার প্রস্থ একটি বড় সেতু অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। সেতুর দুই পাড়ের সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১.৪৬৭ কিলোমিটার। বর্তমানে সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে সেতুটির সুপার স্ট্রাকচার এর কাজ চলমান রয়েছে এবং সব মিলিয়ে কাজের অগ্রগতি প্রায় ৮২ শতাংশ । আশা করা হচ্ছে যে, সেতুটির নির্মাণ কাজ ২০২২ সালের জুন মাসে সম্পন্ন এবং মানুষের ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করা হবে।
নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় আগ্রহী করতে বরিশালে স্থাপন করা হচ্ছে নভোথিয়েটার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার নামে নতুন এই নভোথিয়েটারটি কুসংস্কার দূরীকরণে, জনগণের মধ্যে বিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণা তৈরিতে এবং বৈজ্ঞানিক মনোভাব সঞ্চার করতে ভূমিকা রাখবে।
নভোথিয়েটারটি স্থাপিত হবে বরিশাল সদর উপজেলাধীন দক্ষিণ চরআইচা মৌজায়। এজন্য ৪১২ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প গত ৭ জানুয়ারি একনেক সভায় অনুমোদন করেছে।
এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের মেরিন একাডেমি ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। ১২২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন মেরিন একাডেমির একাডেমিক ভবন, ডরমেটরি ভবন, কমান্ড্যান্টের বাসভবন, ডেপুটি কমান্ড্যান্টের ভবন, কোয়ার্টার, শিক্ষার্থীদের সুইমিং পুল, প্যারেড স্কোয়ার্ড ও বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হতে এখানে পড়াশোনা করতে পারবে।
এদিকে পর্যটন শিল্পের বিকাশে বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় ঐতিহ্যবাহী দুর্গা সাগরকে কেন্দ্র করে নেয়া হয়েছে ১৬ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প। যার টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দুর্গা সাগর দীঘির পর্যটকদের জন্য একটি গেস্ট হাউস, একটি শপিং সেন্টার, বোট ল্যান্ডিং স্টেশন, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
এটি এখন পর্যটকদের এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে একটি সুন্দর স্থান। বিশাল সিমেন্টের প্রশস্ত ঘাটলা, দীঘির মাঝে একটি সুন্দর দ্বীপ রয়েছে। পাশাপাশি যেখানে শীতকালে অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এই পর্যটন কেন্দ্রটি আরও বিকশিত হবে।
এদিকে নারী শিক্ষার বিকাশ ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বরিশালে গড়ে উঠছে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। নগরীর আলেকান্দা রোডে তিন একর জমির উপর স্থাপন করা হচ্ছে এই ইনস্টিটিউট। এখান থেকে ৯ বিভাগ শিক্ষার সুযোগ পাবে ৪০০ ছাত্রী। তাই তাদের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ছাত্রী হোস্টেল।
একাডেমি ভবন, প্রশাসনিক ভবনসহ পাঁচ গ্রুপের এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক বেনজির আহম্মেদ।
বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চলের নারীরাও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হবে। এটি বরিশালের জন্য অন্যতম প্রকল্প।
বরিশাল গণপূর্ত ও গৃহায়ণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জেরাল্ড অলিভার গুডা বলেন, শিশু হাসপাতাল ভবন এই বছরের মধ্যেই শেষ হবে। মেরিন একাডেমি, বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি ভবন চালু ইতিমধ্যে চালু হয়েছে।
বরিশাল দ্য চেম্বার অব কর্মাস ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, এক দিকে পদ্মা সেতু, অন্যদিকে পায়রা সমুদ্রবন্দর। তার মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে বরিশালের চিত্র পাল্টে যাবে। বাড়বে বরিশালের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। আর এসব কাজ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টির কারণে। এজন্য তাকে বরিশালবাসীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার বলেন, ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণ করা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। সম্প্রতি পরিকল্পনামন্ত্রী থেকে শুরু করে সচিবগণ এসব প্রকল্প ভিজিট করেছেন; যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে আলোর মুখ দেখবে। পাশাপাশি বরিশালের সড়ক ও নৌপথকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। আর এর ফলে এখানে ব্যবসায়ীদের উপস্থিত আরও সরব হবে।
বরিশালের জন্য আরও কিছু প্রকল্প অপেক্ষা করছে; যা জেলা প্রশাসক হিসেবে আমি সমন্বয় করার চেষ্টা করছি। পর্যায়ক্রমে এ প্রকল্পগুলোও আলোর মুখ দেখবে।












